ফ্রান্সের ঐতিহাসিক নটরডেম ক্যাথেড্রালের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় এক নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ক্যাথেড্রালের ১৯তম শতকের ঐতিহ্যবাহী রঙিন কাচের জানালা (স্টেইনড গ্লাস) সরিয়ে সেখানে সমসাময়িক বা আধুনিক শিল্প স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি নতুন আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। গত ৬ মে ২০২৬ তারিখে বিভিন্ন হেরিটেজ বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজ এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে ইডব্লিউটিএন নিউজ ও বিবিসি জানিয়েছে। ২০১৯ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ক্যাথেড্রালটি পুনর্নির্মাণ করা হলেও এই নতুন শৈল্পিক পরিবর্তন নিয়ে দেশজুড়ে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
এই বিতর্কের মূলে রয়েছে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর একটি পরিকল্পনা। তিনি ক্যাথেড্রালের নেভ বা মূল হলের ছয়টি ঐতিহাসিক জানালার পরিবর্তে শিল্পী ক্লেয়ার ত্যাবুরেটের নকশা করা আধুনিক রঙিন কাচ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন। সমর্থকদের দাবি, এটি ক্যাথেড্রালের ইতিহাসে বর্তমান সময়ের একটি ছাপ রেখে যাবে। তবে ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ভায়োলেট-লে-ডুক দ্বারা নকশা করা এই জানালাগুলো ক্যাথেড্রালের মূল কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। অগ্নিকাণ্ডের সময় এই জানালাগুলো অক্ষত থাকলেও সেগুলো সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্তকে `ঐতিহাসিক অপরাধ` হিসেবে দেখছেন আন্দোলনকারীরা।
প্যারিসের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এখন বড় প্রশ্ন—ঐতিহ্য কি কেবলই সংরক্ষণ করার বিষয় নাকি তা আধুনিকতার সাথে খাপ খাইয়ে পরিবর্তন করা যায়? আদালত গত বছর এই বিষয়ে একবার স্থগিতাদেশ দিলেও সম্প্রতি প্রকল্পটি পুনরায় গতি পাওয়ায় ক্ষোভ বেড়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, যে সম্পদ অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে গেছে, তাকে কৃত্রিমভাবে সরিয়ে ফেলা যুক্তিহীন। হেরিটেজ সংস্থা `সাইটস এন্ড মনুমেন্টস` এর সভাপতি জুলিয়েন লাকাজ জানিয়েছেন, এই পরিবর্তন ক্যাথেড্রালের স্থাপত্যশৈলীর ভারসাম্য নষ্ট করবে।
অন্যদিকে, প্যারিসের আর্চবিশপ লরেন্ট উলরিচ এই সমসাময়িক শিল্পকলাকে সমর্থন করেছেন। চার্চ কর্তৃপক্ষের মতে, ধর্মীয় স্থাপনায় সময়ের সাথে সাথে নতুন শিল্পের প্রবেশ ঘটা স্বাভাবিক। তবে সাধারণ ফরাসি নাগরিকদের একটি বড় অংশ এই যুক্তি মানতে নারাজ। এই প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ ইউরো বা ৪৭ লাখ মার্কিন ডলার। সমালোচকদের মতে, যখন অন্যান্য হেরিটেজ স্থাপনা তহবিলের অভাবে ধুঁকছে, তখন একটি অক্ষত শিল্পকর্ম সরাতে এত বিপুল অর্থ ব্যয় অপ্রয়োজনীয়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নটরডেম ক্যাথেড্রাল আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও পুনর্নির্মাণের অনেক সূক্ষ্ম কাজ এখনো বাকি। এই আইনি লড়াইয়ের ফলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে যে নতুন স্টেইনড গ্লাসগুলো স্থাপনের কথা ছিল, তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। নটরডেম কেবল একটি উপাসনালয় নয়, এটি ফ্রান্সের জাতীয় পরিচয় ও গর্বের প্রতীক। ফলে এই আইনি লড়াইয়ের রায় ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ নীতির জন্য একটি বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে।
বর্তমানে হেরিটেজ বিশেষজ্ঞরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শিল্পবোদ্ধারাও বিষয়টির ওপর কড়া নজর রাখছেন। কারণ নটরডেমের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষেত্রেও একটি নজির স্থাপন করতে পারে। বিতর্ক সত্ত্বেও ক্যাথেড্রাল দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, তবে ভেতরের এই শৈল্পিক লড়াই এখন প্যারিসের রাজপথ থেকে আদালতের এজলাস পর্যন্ত গড়িয়েছে।
