বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশুদের স্ক্রিন টাইম বা প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন এক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের প্রযুক্তিমুক্ত রাখা বা `স্ক্রিন-মুক্ত শৈশব` এখন একটি নতুন সামাজিক আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব অভিভাবক আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং যাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় আছে, তারা তাদের সন্তানদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে প্রাকৃতিক ও মানবিক বিকাশে বেশি বিনিয়োগ করছেন। বিপরীতে, নিম্নবিত্ত বা কর্মব্যস্ত পরিবারগুলোতে প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে শিশুদের ব্যস্ত রাখার সবচেয়ে সহজ ও সস্তা মাধ্যম।
বিশ্লেষকরা একে বলছেন `ডিজিটাল ক্লাস ডিভাইড` বা ডিজিটাল শ্রেণি বৈষম্য। অনেক ধনী পরিবার এখন তাদের সন্তানদের জন্য `টেক-ফ্রি` স্কুল এবং গৃহশিক্ষক নিয়োগ করছেন, যেখানে কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের অনুমতি নেই। ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালির অনেক প্রযুক্তিবিদ নিজেরাই তাদের সন্তানদের স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখছেন। তাদের মতে, শৈশব হওয়া উচিত ধুলোবালি, খেলাধুলা এবং সরাসরি গল্পের বই পড়ার। তবে এই আদর্শ চিত্রটি সবার জন্য সমান নয়। যেসব অভিভাবক একাধিক শিফটে কাজ করেন বা অর্থনৈতিকভাবে চাপে আছেন, তাদের জন্য স্ক্রিন বা ট্যাবলেট একটি `ডিজিটাল আয়া` হিসেবে কাজ করে, যা শিশুকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।
২০২৬ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতেও এই ব্যবধান প্রকট হচ্ছে। প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিমুক্ত শৈশব উপহার দিতে প্রচুর সময় ও অর্থের প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ, শিশুকে পার্কে নিয়ে যাওয়া, তার সাথে সৃজনশীল কাজ করা বা তাকে খেলার সঙ্গী দেওয়া—এই প্রতিটি কাজের জন্য একজন অভিভাবকের সরাসরি উপস্থিতি প্রয়োজন। কিন্তু যারা জীবনধারণের জন্য নিরন্তর লড়াই করছেন, তাদের পক্ষে এই সময় দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তাদের শিশুরা দীর্ঘ সময় ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত জগতে কাটায়, যা পরবর্তী জীবনে তাদের আচরণ ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সমস্যার সমাধানে বিশেষজ্ঞরা সামাজিক সচেতনতা ও সরকারি হস্তক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন। কেবল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করা এবং অভিভাবকদের কাজের সময় নমনীয় করা প্রয়োজন। পরিবার ও শিশুর মধ্যকার সরাসরি যোগাযোগই হতে পারে সুস্থ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে তা যেন পারিবারিক উষ্ণতা ও মানবিক সম্পর্কের জায়গা দখল করতে না পারে, সেটাই এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিশেষে, স্ক্রিন-মুক্ত শৈশব যেন কেবল সচ্ছলদের বিলাসিতা না হয়ে ওঠে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। প্রতিটি শিশুরই অধিকার আছে একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ শৈশবের। ডিজিটাল ডিভাইড কমিয়ে এনে সব স্তরের পরিবারগুলোতে সুস্থ প্যারেন্টিং চর্চা নিশ্চিত করতে পারলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি শক্তিশালী পারিবারিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বেড়ে উঠতে পারবে।
