শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রযুক্তির চাপে আলগা হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৮, ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

প্রযুক্তির চাপে আলগা হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন

প্রযুক্তির অতিব্যবহার আধুনিক পরিবারের চিরাচরিত উষ্ণতা ও বন্ধনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ২০০০ জন মিলেনিয়াল ও জেন-জেড অভিভাবকদের ওপর পরিচালিত এক জাতীয় জরিপে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এতে দেখা গেছে, প্রায় ৪২ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন যে অতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে তারা তাদের সন্তানদের থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। স্টাডিফাইন্ডস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে চার ঘণ্টার বেশি সময় শিশুরা স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে, যা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সরাসরি কথোপকথন ও মানসিক সংযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।

এই বিচ্ছিন্নতার প্রভাব কেবল অনুভবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং শিশুদের আচরণেও নেতিবাচক পরিবর্তন আনছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী অভিভাবকদের মধ্যে ৪২ শতাংশ জানিয়েছেন তাদের সন্তানরা আগের চেয়ে বেশি অমনোযোগী হয়ে পড়ছে। এছাড়া ৩৪ শতাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানদের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ এবং ৩০ শতাংশ ঘুমের সমস্যায় ভুগছে বলে লক্ষ্য করেছেন। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুরা ধীরে ধীরে তাদের চারপাশের মানুষের থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক জড়তার সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সরকার নতুন একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এমনকি দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের একা কোনো স্ক্রিন (টিভি বা ট্যাবলেট) দেখতে দেওয়া উচিত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। সরকারি তথ্যমতে, প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশু দুই বছর বয়সের আগেই প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে প্রযুক্তির সংস্পর্শে আসছে, যা তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা তৈরি করতে পারে।

প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই করাল গ্রাস থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে ‍‍`ডিজিটাল ডিটক্স‍‍` বা নির্দিষ্ট সময়ে প্রযুক্তিমুক্ত থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে রাতের খাবারের সময় বা শোবার আগে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পরিবারের বড়দেরও উচিত সন্তানদের সামনে উদাহরণ তৈরি করা। কারণ শিশুরা অনুকরণপ্রিয়; তারা যখন দেখে তাদের অভিভাবকরা সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত, তখন তারাও সেই পথেই ধাবিত হয়।

এই জরিপ ও নতুন গাইডলাইন মূলত বিশ্বজুড়ে আধুনিক পরিবারগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করলেও তা যেন প্রাণের স্পন্দন ও আত্মার বন্ধনকে কেড়ে না নেয়। গবেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, শৈশবের সেরা উপহার হলো অভিভাবকের সময় ও মনোযোগ, কোনো দামি গ্যাজেট নয়। পারিবারিক বন্ধন মজবুত করতে হলে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে সরাসরি আলাপচারিতা, যৌথ খেলাধুলা এবং প্রকৃতির কাছাকাছি কাটানো সময়গুলোতে। তবেই আগামী প্রজন্ম একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশে বড় হতে পারবে।

banner
Link copied!