পারিবারিক শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় পবিত্র কুরআন ও হাদিসের দিকনির্দেশনা মেনে চলা প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য অপরিহার্য বলে জানিয়েছেন আধুনিক ইসলামি স্কলাররা। আল জাজিরার ইসলামিক জীবনধারা বিষয়ক এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান যুগে পারিবারিক কলহ ও মানসিক দূরত্ব দূর করতে ধর্মীয় আমল ও পারস্পরিক আচরণের সংশোধন সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ইসলামের পারিবারিক বিধিবিধানগুলো সঠিকভাবে চর্চা করলে ঘরোয়া জীবনে স্থায়িত্ব, শান্তি ও বরকত ফিরে আসে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম ডায়াসপোরা এবং সাধারণ মুসলিম সমাজগুলোতে পারিবারিক ভাঙন রোধে এই আধ্যাত্মিক আমলগুলোর গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইসলামে পরিবারের সুখের জন্য প্রথম এবং প্রধান আমল হলো নিয়মিত ও যৌথভাবে ইবাদত করার অভ্যাস গড়ে তোলা। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরকে কবর না বানানোর তাগিদ দিয়েছেন এবং ঘরে নফল সালাত ও কুরআন তিলাওয়াতের নির্দেশ দিয়েছেন (সহীহ আল-বুখারী, ৪৩২)। নিয়মিত ঘরে পবিত্র কুরআন, বিশেষ করে সূরা আল-বাকারা তিলাওয়াত করলে শয়তানের কুপ্রভাব ও নেতিবাচক শক্তি থেকে ঘর সুরক্ষিত থাকে। সৌদি আরবের ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে নিয়মিত ধর্মীয় অনুশাসন ও তিলাওয়াতের পরিবেশ থাকে, সেখানে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও পারিবারিক বিবাদ অনেক কম হয়।
পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার আরেকটি বড় মাধ্যম হলো একে অপরের প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া এবং সুন্দর ও নম্র আচরণ করা। দাম্পত্য জীবনে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা ও দয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য একটি বিশেষ উপহার ও নিদর্শন (সূরা আর-রুম, ৩০:২১)। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক সমাজতাত্ত্বিক প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ছোটখাটো ভুলত্রুটি উপেক্ষা করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখলে পরিবারের অভ্যন্তরীণ বন্ধন অনেক দৃঢ় হয়। একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া ইসলামি পারিবারিক শিষ্টাচারের অংশ।
পরিবারের সদস্যদের রিযিকের বরকত এবং সার্বিক শান্তির জন্য ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার আমলটি অত্যন্ত অলৌকিক প্রভাব ফেলে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘরে প্রবেশের সময় নিজেদের ওপর সালাম পেশ করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র হিসেবে গণ্য (সূরা আন-নূর, ২৪:৬১)। প্রখ্যাত স্কলারদের মতে, এই সালামের নিয়মিত অভ্যাস পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব, হিংসা ও অহংকার দূর করে মনের ভেতর গভীর মহব্বত ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি করে। এমনকি খালি ঘরে প্রবেশের সময়ও ফেরেশতাহীনের উদ্দেশ্যে সালাম দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
সংসারে স্থায়ী শান্তি ধরে রাখতে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা এবং অল্পে তুষ্টি প্রকাশ করা। ইসলামে অন্যায়, সুদ ও হারাম উপার্জন পারিবারিক অশান্তি ও সন্তানদের অবাধ্যতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পরিবারের প্রধান যদি সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তবে সেই পরিবারে আল্লাহর বিশেষ রহমত নাজিল হয়। হালাল খাবারের প্রভাব মানুষের চিন্তাভাবনা ও আচরণের ওপর সরাসরি পড়ে বলে মুসলিম বিশ্বের বড় বড় ফিকহ একাডেমিগুলোর ফতোয়ায় বারবার জোর দেওয়া হয়েছে।
পারিবারিক বন্ধনকে মজবুত করতে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং পিতা-মাতার প্রতি সদয় আচরণ করাও ইসলামের অন্যতম বড় আমল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রিযিক প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে (সহীহ আল-বুখারী, ৫৯৮৬)। পিতা-মাতার দোয়া সন্তানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এবং পারিবারিক অশান্তির কালো মেঘ দূর করতে পারে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই দ্বীনি শিক্ষায় দীক্ষিত করা এবং তাদের সামনে নিজেদের উত্তম চরিত্র প্রদর্শন করা পিতামাতার বড় দায়িত্ব। ইসলামি সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক শান্তি কেবল মৌখিক আমলের বিষয় নয়, বরং এটি ঈমানি দায়িত্ব ও চারিত্রিক মাধুর্যের একটি সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ।
বিপদের সময় বা দৈনন্দিন জীবনে যেকোনো সংকটে পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে আল্লাহর দরবারে আন্তরিকভাবে দোয়া করার কোনো বিকল্প নেই। পবিত্র কুরআনে উত্তম জীবনসঙ্গী ও নেক সন্তানের জন্য একটি বিশেষ দোয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য ইমাম বানিয়ে দাও (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪)। এই সমস্ত আমল ও জীবনপদ্ধতি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে যেকোনো মুসলিম পরিবার তার হারিয়ে যাওয়া সুখ ও প্রকৃত শান্তি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হতে পারে।
