ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় (ডিআর কঙ্গো) নতুন করে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস মোকাবিলায় চিকিৎসকেরা যখন আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন, তখন এক দশক আগের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ স্মৃতি পুনরায় সামনে চলে এসেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে গিনি, লাইবেরিয়া এবং সিয়েরা লিওনে ইবোলার প্রাদুর্ভাবে ১১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
লাইবেরিয়ার এক সময়ের স্বাস্থ্য স্বেচ্ছাসেবক ও ইবোলা থেকে বেঁচে যাওয়া প্যাট্রিক ফ্যালি সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বর্তমান সংকট উত্তরণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, আক্রান্তদের আইসোলেশন বা পৃথকীকরণের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস অর্জন করা না গেলে এই সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।এই ভাইরাসের ভয়াবহতা ফ্যালির নিজের পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
ফ্যালি লাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ঘুরে ঘুরে মানুষকে বোঝাতেন যে, মৃতদেহের ঐতিহ্যবাহী গোসল বা শেষকৃত্যের প্রথা এই ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান কারণ। কিন্তু সহকর্মীর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার সময় নিজের অসতর্কতায় তিনি নিজেই আক্রান্ত হন এবং তাঁর মাধ্যমে স্ত্রী ও চার বছরের শিশু সন্তান মোমো সংক্রমিত হয়।
ফ্যালি এবং তাঁর স্ত্রী সুস্থ হয়ে ফিরলেও তাঁদের ছোট সন্তানটি বাঁচেনি। কঙ্গোর বর্তমান বুন্দিবুগিও প্রজাতির ইবোলা মোকাবিলাতেও একই ধরনের সামাজিক চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে, যেখানে সন্দেহভাজন মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর না করায় ক্ষুব্ধ জনতা বুনিয়া শহরের একটি হাসপাতালে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আফ্রিকা অঞ্চলের এরিয়া ম্যানেজার ডক্টর প্যাট্রিক ওটিম জানিয়েছেন, অতীতের ইবোলা প্রাদুর্ভাবের শিক্ষা থেকে তাঁরা জেনেছেন যে এই যুদ্ধে সময়ক্ষেপণ করা মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় রোগী শনাক্ত ও তাঁদের বিচ্ছিন্ন করতে দেরি হলে সংক্রমণের চেইন বা ধারা অত্যন্ত দ্রুত বিস্তৃত হয়। ওটিম স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল ল্যাবরেটরি বা উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র দিয়ে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ দাফন ব্যবস্থা এবং স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে সঠিক তথ্য আদান-প্রদান করা চিকিৎসা ব্যবস্থার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কঙ্গোতে ১৯৭৬ সালে প্রথম ইবোলা আবিষ্কারের পর থেকে এটি দেশটির ১৭তম প্রাদুর্ভাব হলেও বিরল `বুন্দিবুগিও` প্রজাতির ক্ষেত্রে এটি বিশ্বে মাত্র তৃতীয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জাইর প্রজাতির জন্য ব্যবহৃত প্রচলিত `এরভেবো` ভ্যাকসিনটি এই নতুন প্রজাতির বিরুদ্ধে কোনো কাজ করে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটির মেডিকেল ব্রাঞ্চের ভাইরোলজিস্ট প্রফেসর থমাস গিসবার্ট জানিয়েছেন, বুন্দিবুগিও প্রজাতির জেনেটিক গঠন প্রচলিত জাইর প্রজাতি থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ আলাদা। ল্যাবরেটরিতে নতুন প্রতিষেধক তৈরির সফল পরীক্ষা হলেও এটিকে মানবদেহে ট্রায়াল ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে নিতে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর কাছে লাভজনক মনে হচ্ছে না।
কেনিয়ার নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির অধ্যাপক ওয়ালেস বুলিমো এই অবহেলার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন যে, ২০০৭ সালে এই প্রজাতিটি প্রথম আবিষ্কৃত হলেও এত বছর ধরে কার্যকর প্রতিষেধক তৈরিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করা একটি বড় ভুল ছিল। তবে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা আশ্বস্ত করেছেন যে, তাদের একটি নতুন ভ্যাকসিন আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। এদিকে প্যাট্রিক ফ্যালি বর্তমান মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সতর্ক করে বলেছেন, গণমাধ্যমে `এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই` এমন বার্তা প্রচার করলে মানুষ ভয়ে চিকিৎসা কেন্দ্রে আসা বন্ধ করে দেবে, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
