মহানবী (সা.) তাঁর ৬৩ বছরের জীবদ্দশায় মাত্র একবার হজ করেছেন। সেটি ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ও সর্বশেষ হজ, তাই একে ‘বিদায় হজ’ বলে অভিহিত করা হয়। দশম হিজরির শেষ লগ্নে মহানবী (সা.) হজের ঘোষণা দিলে মদিনাবাসীর মধ্যে তুমুল উদ্দীপনার জোয়ার সৃষ্টি হয় এবং সোয়া লাখ সাহাবির সঙ্গী হয়ে তিনি হজে রওনা হন।জিলহজ মাসের ৯ তারিখ আরাফার ময়দানে মহানবী (সা.) প্রদান করেন ঐতিহাসিক বিদায়ি ভাষণ।
ভাষণটির সূচনায় তিনি সাহাবিদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেন, হে আমার প্রিয় সাহাবিরা, আজ যে কথা আমি তোমাদের বলব মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, তোমাদের সঙ্গে একত্রে হজ করার সুযোগ আর আমার হবে না। এই কথাটি সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে, যা ছিল তাঁর বিদায়ের স্পষ্ট সংকেত।তিনি সব মুসলমানকে ভাই ভাই হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেন।
ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সব মুসলমান ভাই ভাই এবং আল্লাহর চোখে সবাই সমান, কেউ কারো চেয়ে ছোট বা বড় নয়। নারী জাতির অধিকার ও পুরুষের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি তিনি ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করার সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, এই বাড়াবাড়ির কারণেই অতীতে বহু জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।প্রতিটি মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত পবিত্র বলে তিনি ঘোষণা করেন।
তিনি হুঁশিয়ার করে দেন যে, আমিরের আদেশ মেনে চলা এবং দাস-দাসীদের সঙ্গে সর্বদা সদ্ব্যবহার করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। তিনি স্পষ্ট ভাষায় শিরক, চুরি, মিথ্যা কথা ও ব্যভিচারের মতো পাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার আহ্বান জানান। বংশের গৌরবে অহংকার না করার কঠোর নির্দেশ দিয়ে তিনি সবাইকে সত্যাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দেন।কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
তিনি বলেন, আমি যা রেখে যাচ্ছি তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো বিভ্রান্ত হবে না। সেই গচ্ছিত সম্পদ হলো আল্লাহর কোরআন এবং তাঁর রাসুলের সুন্নাহ। ভাষণ শেষে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আবেগভরে আল্লাহর সাক্ষী হওয়ার আবেদন জানান এবং উপস্থিত জনতা একযোগে সেই বাণীর সত্যতা স্বীকার করে।
এই ভাষণ আরাফার ময়দানের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে আজও অমলিন।
আমাদের জন্য এই ভাষণে রয়েছে জীবনের প্রতিটি স্তরের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। ন্যায়বিচার, সাম্য ও পবিত্রতার এই শিক্ষাগুলো আজকের সমাজেও অপরিহার্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই দিকনির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন।
তথ্যসূত্র: মুসলিম, সীরাতে ইবনে হিশাম, সীরাতে মুস্তাফা।
