শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় দীর্ঘস্থায়ী হাড়ের প্রতিস্থাপন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২৩, ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় দীর্ঘস্থায়ী হাড়ের প্রতিস্থাপন

চিকিৎসা বিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার হাড়ের প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং কার্যকর করার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের অর্থোপেডিকস বিভাগের অধ্যাপক আমির জাদপুর এবং তাঁর গবেষক দল এমন এক বিস্ময়কর নতুন উপাদানের সন্ধান করছিলেন যা মানুষের প্রাকৃতিক হাড়ের মতো শক্ত হবে কিন্তু একই সাথে নমনীয় আচরণ করবে। 

সাধারণ নিয়মে কোনো ইলাস্টিক ব্যান্ড বা রাবার টেনে দুই দিক থেকে লম্বা করলে সেটি মাঝখান থেকে ক্রমশ চিকন ও সরু হয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই জটিল প্রয়োজনে গবেষকদের এমন একটি অভাবনীয় উপাদানের প্রয়োজন ছিল যা টানলে চিকন হওয়ার পরিবর্তে উল্টো চারপাশ থেকে আরও বেশি মোটা ও মজবুত হবে, যা এক প্রকার পদার্থবিদ্যার চেনা নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই প্রায় অসম্ভব মেকানিক্যাল চ্যালেঞ্জকে সম্ভব করে তুলেছে।

চিকিৎসকদের মতে, হিপ বা হাড়ের প্রতিস্থাপন বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত সাধারণ একটি অর্থোপেডিক অস্ত্রোপচার হলেও এর দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কৃত্রিম হিপ প্রতিস্থাপনের পর একজন মানুষকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বছরে প্রায় ২০ লাখ কদম বা স্টেপ ফেলতে হয়, যার ফলে কৃত্রিম জয়েন্টের ওপর অনবরত প্রচণ্ড চাপ ও যান্ত্রিক বল সৃষ্টি হয়। 

এই ক্রমাগত ঘর্ষণের কারণে সাধারণত এক দশক বা বারো বছর ব্যবহারের পরে এই কৃত্রিম উপাদানগুলো সম্পূর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে রোগীকে পুনরায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হতে হয়। আমির জাদপুর এবং তাঁর সহকর্মীরা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে ইমপ্ল্যান্টের গোড়ায় দুটি ভিন্ন ধরনের মেটাম্যাটেরিয়াল বা কৃত্রিম উপাদান যুক্ত করার পরিকল্পনা করেন, যার একটি অংশ চাপের সময় সংকুচিত হয়ে মোটা হবে এবং অন্য অংশটি টান লাগলে প্রসারিত হয়ে মোটা হবে।

গবেষণায় দেখা গেছে যে টানলে মোটা হয়ে যাওয়ার এই বিশেষ ধর্মকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‍‍`অক্সেনিক‍‍` বলা হয়ে থাকে। সাধারণত এই অক্সেনিক উপাদানগুলো অত্যন্ত নরম প্রকৃতির হয়, যা মূলত ক্র্যাশ হেলমেট বা হাঁটুর সুরক্ষামূলক প্যাডে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু হাড়ের ভারী ওজন ও চাপ সহ্য করার জন্য একই সাথে উচ্চ শক্তিমত্তা ও অক্সেনিক গুণের সংমিশ্রণ ঘটানো বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। 

এই জটিল নকশাটি নিখুঁতভাবে তৈরি করতে গবেষক দল মেশিন লার্নিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেন। এআই সিস্টেমকে বিভিন্ন উপাদানের আচরণগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, যা মুহূর্তের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত উপাদানের আণবিক নকশা তৈরি করে দেয়।

মেটাম্যাটেরিয়াল হলো এমন এক ধরনের কৃত্রিম উপাদান যার মাইক্রোস্কোপিক বা অণুবীক্ষণিক গঠন পরিবর্তনের মাধ্যমে অত্যন্ত অদ্ভুত ও অলৌকিক বৈশিষ্ট্য দেওয়া সম্ভব। নেদারল্যান্ডসের টিইউ ডেলফট ইউনিভার্সিটির মেটেরিয়াল সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সিড কুমার জানান, একটি নতুন উপাদানের নকশা তৈরির জন্য এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু একবার মডেলটি প্রস্তুত হয়ে গেলে মাত্র কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের মধ্যে এটি অত্যন্ত নিখুঁত ও কার্যকর নকশা তৈরি করতে সক্ষম হয়। 

পদার্থবিদ্যার চিরাচরিত গাণিতিক নিয়ম বা সনাতন সিমুলেশনের মাধ্যমে এই ধরনের জটিল আণবিক গঠন খুঁজে বের করা বিজ্ঞানীদের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। সিড কুমার এবং তাঁর সহকর্মীরা এখন এআই-এর মাধ্যমে লাখ লাখ সম্ভাব্য উপাদানের গঠন পরীক্ষা করে দেখছেন, যা মানুষের হাড়ের প্রাকৃতিক গুণাবলিকে হুবহু অনুকরণ করতে পারে।

এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ হলো বয়স্ক মানুষের জটিল হাড় ভাঙা বা ফ্র্যাকচার নিরাময় করা। বর্তমানে হাড় জোড়া দেওয়ার জন্য টাইটানিয়াম বা স্টিলের তৈরি প্লেট, স্ক্রু এবং রড ব্যবহার করা হয়, তবে অনেক সময় এই ধাতব উপাদানের চারপাশে প্রাকৃতিক হাড় সঠিকভাবে বৃদ্ধি পায় না। ফলে আক্রান্ত স্থানটি দুর্বল থেকে যায় এবং ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে। এআই-এর মাধ্যমে তৈরি নরম মেটাম্যাটেরিয়াল ইমপ্ল্যান্ট মানুষের শরীরের নিজস্ব অ্যানাটমি বা শারীরিক গঠনের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে, যা ভাঙা হাড়ের দ্রুত ও স্থায়ী নিরাময় নিশ্চিত করবে।

banner
Link copied!