রাজনৈতিক চরম উত্তেজনা ও বৈরী সম্পর্কের আবহ দূরে ঠেলে দীর্ঘ আট বছর পর দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে খেলতে নেমেছে উত্তর কোরিয়ার অ্যাথলেটরা। সিউলের অদূরে সুওন স্টেডিয়ামে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে গ্যালারিতে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় পাঁচ হাজার দর্শক। এশিয়ান উইমেনস চ্যাম্পিয়ন্স লিগের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুই শীর্ষ ক্লাব। রোমাঞ্চকর এই ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার সুওন এফসি উইমেনকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ংভিত্তিক ক্লাব নায়েগোহিয়াং উইমেনস এফসি।দ্বিতীয়ার্ধের চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সে জয় নিশ্চিত করে উত্তর কোরিয়ার নায়েগোহিয়াং।
মাইনাস ওয়ান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচটিতে জয়সূচক গোল দুটি করেন চোয়ে কুম ওক এবং কিম কিয়ং ইয়ং। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ জাপানের বিখ্যাত ক্লাব টোকিও ভেয়ার্ডি বেলেজা। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম উত্তর কোরিয়ার কোনো খেলোয়াড় সীমান্ত পার হয়ে দক্ষিণে খেলতে এলেন। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যেখানে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য বাতিল করে আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে একটি `শত্রু রাষ্ট্র` হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তবে রাজনৈতিক বৈরিতা থাকলেও নারী ফুটবলে উত্তর কোরিয়ার আধিপত্য বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ফিফা র্যাংকিংয়ে বর্তমানে তাদের অবস্থান ১১তম, যা এশিয়ার মধ্যে জাপানের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০১২ সালে পিয়ংইয়ংয়ে প্রতিষ্ঠিত নায়েগোহিয়াং ক্লাবটি ২০২২ সালে ঘরোয়া লিগ শিরোপা জয় করে। এই দলে জাতীয় দলের বেশ কয়েকজন তারকা খেলোয়াড় রয়েছেন এবং দলটির কোচের দায়িত্বে আছেন জাতীয় নারী দলের সাবেক প্রধান প্রশিক্ষক।
সিউলের ডংগুক বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর কোরিয়া বিষয়ক অধ্যাপক কিম ইয়ং-হিউন জানান, পিয়ংইয়ং তরুণ ফুটবল প্রতিভা অন্বেষণ ও প্রশিক্ষণে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে থাকে। ২০১৩ সালে পিয়ংইয়ংয়ের রুনগনা দ্বীপে নির্মিত আন্তর্জাতিক ফুটবল স্কুলটি বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরির প্রধান কারখানা হিসেবে কাজ করছে। এ ধরনের অভিজাত ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল স্তর থেকেই প্রতিভাবান শিশুদের বাছাই করে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও উত্তর কোরিয়ার এই ক্রীড়া সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের রাজনৈতিক প্রচারণার একটি বড় হাতিয়ার। সফল নারী অ্যাথলেটদের রাষ্ট্রীয়ভাবে বিলাসবহুল গাড়ি, ফ্ল্যাট বাড়ি এবং ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্যপদ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়, যা দেশটির কঠোর সামাজিক স্তরে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। ২০২৪ সালের ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ এবং ২০২৫ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ নারী বিশ্বকাপে উত্তর কোরিয়ার শিরোপা জয় তাদের বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
