গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী ইবোলা মহামারি এখনো চূড়ান্তে পৌঁছায়নি এবং এটি আরও এক বছর স্থায়ী হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস সতর্ক করেছে, আল জাজিরা ও রয়টার্স জানিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের অপারেশন ম্যানেজার ব্রুনো মিশোঁ। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় field পর্যায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি স্পষ্ট করেন যে, মহামারির সবচেয়ে ভয়াবহ সময়টি এখনো পার হয়নি, বরং তা সামনে অপেক্ষা করছে। এই রোগ পুরোপুরি নির্মূল করতে আরও দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে বলে মানবিক সহায়তা সংস্থাটি মনে করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাইরাসের সংক্রমণের প্রকৃত বিস্তার এবং গতিপথ নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দিয়েছিল। অত্যন্ত বিরল বুন্দিবুজিও স্ট্রেইনের এই ভাইরাসের আক্রমণে কঙ্গোতে ইতিমধ্যে অন্তত ১৯২ জন মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্ত অনুযায়ী, রোগটি দেশটির তিনটি প্রধান প্রদেশে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে ইতুরি, উত্তর কিভু এবং দক্ষিণ কিভু অন্যতম, যার মধ্যে ইতুরি প্রদেশেই সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এই ভাইরাসটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং মানুষের শরীরের তরল পদার্থের মাধ্যমে ছড়ায়, এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর পরও সংক্রমণের ঝুঁকি অপরিবর্তিত থাকে। ফলে মৃতদেহের নিরাপদ দাফন সম্পন্ন করা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ করা স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে রেড ক্রস এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবীরা ব্যাপক সামাজিক বাধা এবং সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন। গত কয়েক দিনে নিরাপদ দাফন এবং জনসচেতনতা তৈরিতে নিয়োজিত দলগুলোর ওপর মৌখিক গালিগালাজ, হুমকি এবং সরাসরি শারীরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে ব্রুনো মিশোঁ উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, সংকটের এই মুহূর্তে স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়। এই মহামারি প্রতিরোধে সততা, ধৈর্য এবং নম্রতার সাথে কাজ করা প্রয়োজন, কারণ জোরপূর্বক কোনো স্বাস্থ্যবিধি চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা গেলে এই স্বাস্থ্য সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে এই প্রাদুর্ভাবকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে মাঠপর্যায়ে চিকিৎসাসেবা ও নজরদারির ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে। আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং সময়মতো রোগ নির্ণয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, প্রত্যন্ত ও অঞ্চলগুলোতে ঠিক কতজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, কারণ অনেক মৃত্যুর ঘটনা এখনো পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কঙ্গোর এই ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নতুন করে ইবোলার এই আঘাত সামগ্রিক মানবিক পরিস্থিতিকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই বিরল বুন্দিবুজিও স্ট্রেইনের জন্য বর্তমানে কোনো অনুমোদিত প্রতিষেধক বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি নেই, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। বিগত বছরগুলোতে কঙ্গোতে ব্যবহৃত ইবোলার অন্যান্য টিকা এই স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কার্যকর নয় বলে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন। এর ফলে চিকিৎসকদের শুধুমাত্র আক্রান্ত রোগীদের বাহ্যিক লক্ষণ উপশম এবং নিবিড় পরিচর্যার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো ইতিমধ্যে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়ে হিমশিম খাচ্ছে এবং জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে, যা আঞ্চলিক মহামারি রূপ নেওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
