শরীরের চর্বি পুরোপুরি ঝরিয়ে পেশিবহুল বা অতিমাত্রায় রোগা হওয়ার সামাজিক প্রবণতা মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক ভারসাম্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ওজন কমানোর ওষুধের বিস্তার এবং শরীরচর্চার নানা প্রচারণায় চর্বিকে দীর্ঘদিন ধরে একতরফাভাবে ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে দেখানো হলেও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন ভিন্ন তথ্য। তাদের মতে, চর্বি কেবল একটি নিষ্ক্রিয় আবরণ নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সক্রিয় অঙ্গ যা মানবদেহের হরমোন নিঃসরণ, বিপাকক্রিয়া এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক কাজ করে। মাত্রাতিরিক্ত চর্বি যেমন হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের জন্ম দেয়, তেমনই স্বাভাবিকের চেয়ে কম চর্বি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
চর্বি ছাড়া মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া চালানো অসম্ভব।
চিকিৎসা গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করা শর্করা গ্লুকোজে, আমিষ অ্যামিনো অ্যাসিডে এবং চর্বি ফ্যাটি অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালোরি এডিপোসাইট নামের চর্বি কোষে শক্তিভাণ্ডার হিসেবে জমা থাকে। সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল ও পরীক্ষামূলক ফ্যাট টিস্যু গবেষণার অধ্যাপক মিকায়েল রাইডেন জানান, চর্বি হলো শরীরের একটি বিশেষ সংরক্ষিত ভল্ট, যা পর্যাপ্ত খাবারের সময় শক্তি জমা রাখে এবং সংকটের সময় তা মুক্ত করে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। সাদা চর্বি শরীরকে উষ্ণ রাখতে প্রাকৃতিক নিরোধক হিসেবে কাজ করে এবং বাদামি চর্বি শক্তি পুড়িয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
ক্ষতিকর খাদ্যচর্বি আর শরীরের প্রাকৃতিক চর্বি এক নয়।
চর্বি হরমোন উৎপাদনের অন্যতম প্রাথমিক কারখানা হিসেবে কাজ করে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এলিফ ওরাল জানান, চর্বি কোষ থেকে লেপটিন নামের একটি বিশেষ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত শক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করে। মস্তিষ্কে লেপটিনের সংকেত পৌঁছালে শরীর প্রজনন ক্ষমতা ও সংক্রমণ প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে। বিপরীতে শরীরে চর্বির ঘাটতি দেখা দিলে মস্তিষ্ক খাদ্যসংকট বা অনাহার পরিস্থিতি ধরে নেয়। এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হতে থাকে এবং সঞ্চিত চর্বির অভাবে শরীর নিজের পেশি ক্ষয় করে শক্তি জোগাতে বাধ্য হয়।
হাড়ের গঠন দুর্বল হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি হাড় ভাঙার ঝুঁকিও এতে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপাকীয় মেডিসিনের অধ্যাপক ফ্রেডরিক কার্পে জানান, চর্বিশূন্য দেহে কোনো জরুরি রিজার্ভ বা মজুত থাকে না, যার কারণে মারাত্মক অসুস্থতা বা অস্ত্রোপচারের ধকল সহ্য করা সম্ভব হয় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে স্থূলতার এক অদ্ভুত সুবিধা হিসেবেও দেখা হয়; কারণ দেখা গেছে, কিছুটা বাড়তি ওজনের ব্যক্তিরা আকস্মিক হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে অতিরিক্ত রোগা ব্যক্তিদের চেয়ে দ্রুত সেরে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত চর্বিহীন পুরুষদের টেস্টোস্টেরন হরমোন হ্রাস পায় এবং নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সাধারণ হিসাবে প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ পুরুষের শরীরে দশ থেকে বিশ শতাংশ এবং নারীদের শরীরে বিশ থেকে উনত্রিশ শতাংশ চর্বি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর বলে ধরা হয়। ডেক্সা স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সাতশত ক্রীড়াবিদের শারীরিক গঠন পরীক্ষা করে দেখা গেছে, নিয়মিত কঠোর প্রশিক্ষণে থাকা অ্যাথলেটদের শরীরেও পুরুষের ক্ষেত্রে চর্বি কখনো দশ শতাংশ এবং নারীর ক্ষেত্রে ষোলো শতাংশের নিচে নামে না। অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকে ঘিরে থাকা পেটের ভিসেরাল ফ্যাট রক্তচাপ ও ইনসুলিন প্রতিরোধের জন্য ক্ষতিকর হলেও ত্বকের নিচের সাধারণ চর্বি জীবন রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। বডি মাস ইনডেক্স পেশি ও চর্বির পার্থক্য ধরতে পারে না বলে বিশেষজ্ঞরা কোমর ও উচ্চতার অনুপাত স্বাভাবিক মাত্রায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।
