সোমবার, ০৪ মে, ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

মাশরুম থেরাপিতে ছাড়ানো যাবে ধূমপানের নেশা, দাবি গবেষকদের

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৪, ২০২৬, ০৭:০০ পিএম

মাশরুম থেরাপিতে ছাড়ানো যাবে ধূমপানের নেশা, দাবি গবেষকদের

নিকোটিনের আসক্তি কাটানো পৃথিবীর অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। গবেষকরা বলে থাকেন যে তামাকের ভেতরে থাকা নিকোটিন কোকেন কিংবা হেরোইনের চেয়েও বেশি আসক্তি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘকাল ধরে যারা ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন, তাদের জন্য এবার এক অভাবনীয় আশার আলো নিয়ে এসেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ‘ম্যাজিক মাশরুম’ বা এক বিশেষ ধরনের ছত্রাকের প্রধান সাইকোঅ্যাক্টিভ উপাদান ধূমপান ছাড়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত নিকোটিন প্যাচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কার্যকর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণায় সিলোসাইবিন নামক একটি উপাদানের এমন সব গুণের কথা উঠে এসেছে যা নেশার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিতে সক্ষম।

পরিসংখ্যান বলছে যে প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীদের প্রায় ৭০ শতাংশই এই মরণঘাতী নেশা থেকে মুক্তি পেতে চান। তবে বাস্তবতা হলো প্রতি বছর যারা চেষ্টা করেন তাদের মধ্যে ১০ জনের একজনও সফল হতে পারেন না। এই প্রেক্ষাপটে সিলোসাইবিনের কার্যকারিতা নিয়ে চালানো একটি সমীক্ষা বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে। ২০১৭ সালে করা এক জরিপে প্রায় ৭৮১ জন ব্যক্তি জানিয়েছিলেন যে এলএসডি কিংবা ম্যাজিক মাশরুমের মতো সাইকেডেলিক উপাদান ব্যবহারের পর তারা হয় ধূমপান কমিয়ে দিয়েছেন অথবা সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়েছেন। বিষয়টি কেবল অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং সাম্প্রতিক গবেষণাগারের পরীক্ষায় এর শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা ও আচরণগত বিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাথিউ জনসন এবং তার সহকর্মীরা এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী টক থেরাপি বা কাউন্সেলিংয়ের সঙ্গে সিলোসাইবিনের একক ডোজ ব্যবহার করলে তা নিকোটিন প্যাচের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো ফলাফল দেয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৪২ জন ব্যক্তির ওপর চালানো পরীক্ষার ছয় মাস পর দেখা গেছে যে যারা সিলোসাইবিন নিয়েছিলেন তাদের ধূমপান ছাড়ার হার নিকোটিন প্যাচ ব্যবহারকারীদের তুলনায় ছয় গুণ বেশি। গবেষক ম্যাথিউ জনসন জানিয়েছেন যে এই অভিজ্ঞতার গভীরতা এতটাই বেশি ছিল যে তা ধূমপান ছাড়ার মতো দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জকে ছাপিয়ে গেছে। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই জানিয়েছেন যে এই সিলোসাইবিন গ্রহণের ফলে তাদের জীবন দর্শনে আমূল পরিবর্তন এসেছে এবং তারা বুঝতে পেরেছেন যে ধূমপান তাদের জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে আর খাপ খাচ্ছে না।

তবে কেন ম্যাজিক মাশরুম বা সিলোসাইবিন এই নেশা ছাড়তে এত বড় ভূমিকা রাখে তা নিয়ে এখনো কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন যে এটি মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তা করার ধরনকে ‘রিপ্রোগ্রাম’ বা নতুন করে সাজিয়ে দিতে পারে। জনসন উল্লেখ করেছেন যে এক অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন তার কাছে মনে হয়েছে যেন তার মস্তিষ্ক এমনভাবে নতুন করে সাজানো হয়েছে যেখানে একটি সিগারেট স্পর্শ করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক মেগান পাইপার এই গবেষণাকে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে যুক্তরাষ্ট্রে গত ২০ বছরে ধূমপান বন্ধ করার জন্য নতুন কোনো বড় ওষুধ আসেনি অথচ ধূমপান বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে এ ধরনের নতুন সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

যদিও বিশ্বে সাইকেডেলিক ড্রাগ বা এ জাতীয় উপাদানগুলোর ব্যবহার বেশিরভাগ দেশে এখনো নিষিদ্ধ এবং গবেষণার বাইরে এর ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। তবে কেরালা কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোতেও অ্যালকোহল বা মদ্যপানের নেশা কাটাতে আগে থেকেই এ ধরনের উপাদানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে আসছে। ১৯৫০-এর দশকে অ্যালকোহল আসক্তি কাটাতে এলএসডির ব্যবহার সফল হয়েছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক নথিতে পাওয়া যায়। এদিকে ধূমপান ছাড়ার এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ১৩ সপ্তাহ ধরে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির পাশাপাশি সিলোসাইবিন দেওয়া হয়েছিল। যদিও গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে বড় এবং আরও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর এর পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত এর কার্যকারিতা সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে না। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যগুলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে যা অদূর ভবিষ্যতে কয়েক কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

banner
Link copied!