যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী কয়েক দশকে অবিবাহিত ব্রিটিশ মায়েদের কাছ থেকে জোরপূর্বক শিশু দত্তক নেওয়ার ঘটনায় আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তিনি এই প্রথাকে জাতীয় ইতিহাসের জন্য একটি কলঙ্ক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তিনি এই ঘটনার শিকার প্রতিটি ব্যক্তির কাছে গভীর ও আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার এবং বিভিন্ন খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে এই ব্যবস্থা চালু ছিল, যেখানে মূলত কম বয়সী মায়েদের চাপ ও ভয় দেখিয়ে তাদের সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতো।
সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন নথিপত্র অনুযায়ী এই সময়ে প্রায় ১,৮৫,০০০ শিশুকে তাদের মায়েদের কাছ থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী স্টারমার তার বক্তব্যে স্বীকার করেছেন যে রাষ্ট্র সেই সময়ে মা, শিশু এবং পরিবারগুলোকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই পদ্ধতিগত ব্যর্থতার দায় নিয়ে তিনি গভীরভাবে অনুতপ্ত বলে জানান। গত কয়েক সপ্তাহ আগে চার্চ অব ইংল্যান্ড একই বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল। মূলত চার্চ পরিচালিত মা ও শিশু নিবাসগুলোতে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রেখে সন্তান জন্মদানের পর শিশুকে আলাদা করে ফেলার ঘটনা ঘটেছিল।
চার বছর আগে একটি সংসদীয় কমিটি সরকারিভাবে ক্ষমা চাওয়ার সুপারিশ করেছিল। দীর্ঘ তদন্তের পর কমিটি মায়েদের ওপর হওয়া অমানবিক নির্যাতনের তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরে। নির্যাতিত নারীদের মধ্যে অনেকেই জানিয়েছেন যে প্রসব বেদনার সময় তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হয়নি। ডাক্তাররা তাদের শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এমনটি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা মায়েদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার জন্য আপত্তিকর মন্তব্যও করেছেন।
১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসে গর্ভপাত আইনগত বৈধতা পেলেও অনেক ক্ষেত্রে নারীরা চিকিৎসকদের বাধার কারণে সেবা পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। চার্চ অব ইংল্যান্ডের আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবেরি সারাহ মুললি গত মাসে এক বিবৃতিতে এই প্রথার শিকার মা ও শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া লজ্জা এবং অবমাননার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধানে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে এমন আচরণ করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সরকার এই ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য ৪ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন। এই অর্থ দত্তক সংক্রান্ত নথিপত্র খুঁজে পেতে সাহায্য করা, আত্মীয়দের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের জন্য সেবা প্রদান এবং ভুক্তভোগীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে গবেষণার কাজে ব্যয় করা হবে। অস্ট্রেলিয়ার সরকার ২০১৩ সালে এবং আয়ারল্যান্ড ২০২১ সালে একই ধরনের জোরপূর্বক দত্তক নেওয়ার ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছিল। যুক্তরাজ্য সরকারের এই আনুষ্ঠানিক দায় স্বীকারের মাধ্যমে ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ভুক্তভোগীদের কিছুটা হলেও মানসিক প্রশান্তি দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। স্টারমার দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন যে এই ঘটনার দায়ভার রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায় এবং এমন অমানবিক আচরণের পুনরাবৃত্তি যেন কখনো না ঘটে সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।
