মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

মায়ানমারে স্ক্যাম সেন্টারে পাঁচ হাজার মানুষ বন্দী

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২৩, ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম

মায়ানমারে স্ক্যাম সেন্টারে পাঁচ হাজার মানুষ বন্দী

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মায়ানমারে স্ক্যাম সেন্টারে পাঁচ হাজার তিনশরও বেশি মানুষ এখনও আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের হাতে বন্দী হয়ে রয়েছেন বলে থাইল্যান্ডভিত্তিক একটি সক্রিয় মানবাধিকার সংস্থা নিশ্চিত করেছে, আল জাজিরা এবং রয়টার্স জানিয়েছে। থাই সীমান্ত সংলগ্ন দুর্গম এলাকায় গত বছর একাধিক দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি বড় ধরনের বহুজাতিক যৌথ অভিযান চালানো সত্ত্বেও এই অবৈধ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। থাইল্যান্ডে অবস্থিত সিভিল সোসাইটি নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান ট্রাফিকিং ভিকটিম অ্যাসিস্ট্যান্স নামক আঞ্চলিক সংস্থাটি সম্প্রতি থাই পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে একটি জরুরি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে দ্রুত ও কার্যকর সামরিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়েছে।

উক্ত থাই মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠির তথ্য অনুযায়ী, মায়ানমারের ডেমোক্রেটিক কারেন বুদ্ধিস্ট আর্মি নামক একটি স্থানীয় সশস্ত্র বৌদ্ধ মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সরাসরি নিয়ন্ত্রিত অন্তত চারটি ভিন্ন ও সুরক্ষিত আস্তানায় এই বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক নাগরিককে জোরপূর্বক আটকে রাখা হয়েছে। সেখানে বন্দী থাকা অসহায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে একটি বড় অংশ অর্থাৎ আনুমানিক এক হাজার切换ছয়শত জনই গণচীনের নাগরিক এবং প্রায় দুইশত জন মায়ানমারের স্থানীয় অধিবাসী বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও ফিলিপাইন, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, রাশিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা এবং জিম্বাবুয়ের মতো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের দেশগুলোর নাগরিকরা এই পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে সেখানে দাসত্বের মতো চরম অমানবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই আন্তর্জাতিক অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো দীর্ঘ দিন ধরে কোনো বাধা ছাড়াই ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে কোটি কোটি ডলারের ব্যাপক অনলাইন আর্থিক প্রতারণা, সাইবার অপরাধ ও মানব পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মায়ানমার এবং কম্বোডিয়ার এই আধুনিক দাসত্বের অবৈধ কেন্দ্রগুলো মূলত বৈশ্বিক অতিমারী করোনার অবরুদ্ধ সময়ে ওই অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। শুরুর দিকে এই কেন্দ্রগুলো মূলত লোকসান হওয়া ক্যাসিনো ব্যবসা এবং অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন জুয়ার আড্ডার সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত থাকলেও বর্তমানে এটি বিশ্বজুড়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল কালো অর্থনীতি ও অপরাধ শিল্পে পরিণত হয়েছে বলে জাতিসংঘের একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই আধুনিক বন্দিশালাগুলো মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র দ্বারা পাচার হয়ে আসা চরম ভাগ্যবিড়ম্বিত বিদেশি নাগরিকদের দ্বারা জোরপূর্বক পরিচালনা করা হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্ক এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে এই কেন্দ্রগুলোতে আটকে থাকা মানুষদের ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন, অন্যান্য নিষ্ঠুর আচরণ, ভয়াবহ যৌন নিপীড়ন ও শোষণ, নারীদের জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো, নিয়মিত পর্যাপ্ত খাদ্য থেকে বঞ্চিত রাখা এবং দীর্ঘ দিন নির্জন কারাবাসে বন্দি রাখার মতো অত্যন্ত গুরুতর ও loমহর্ষক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে এই দুর্ভাগা ভুক্তভোগীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা, মানসিক যত্ন ও উপযুক্ত পুনর্বাসন দেওয়ার পরিবর্তে তারা প্রায়শই স্থানীয় প্রশাসনের গভীর অবিশ্বাস, সামাজিক কলঙ্ক এবং বিভিন্ন দেশের প্রচলিত আইনে অন্যায় শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছেন।

এই বিশাল অপরাধ নেটওয়ার্কের কারণে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত সম্পদ ক্রমাগত চরম হুমকির মুখে পড়ছে যা বিভিন্ন দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই আন্তর্জাতিক অপরাধী সিন্ডিকেটগুলোর মূল অর্থদাতা ও হোতাদের আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে চিরতরে নির্মূল করতে থাইল্যান্ড ও মায়ানমারের জান্তা সরকার কতটুকু আন্তরিক ও সমন্বিত সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার পরিবারের আর্থিক দেউলিয়াত্ব এবং শত শত তরুণ-তরুণীর জীবন ধ্বংসের পেছনে দায়ী এই আধুনিক দাস প্রথার অবসান ঘটাতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে অবিলম্বে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

banner
Link copied!