উত্তর আমেরিকায় চলমান বিশ্বকাপ ২০২৬ এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন ও ভিসা নীতির কারণে ইরান ফুটবল দল ও সাধারণ বিশ্ব সমর্থকরা নজিরবিহীন বৈষম্য এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সীমান্ত কড়াকড়ির মুখোমুখি হচ্ছে বলে আল জাজিরা ও রয়টার্স মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক এই ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার ভক্তদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে এবং অনেক খেলোয়াড়কে সীমান্তে প্রশিক্ষিত কুকুর দ্বারা তল্লাশি করার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। সবচেয়ে নাটকীয় বিষয় হলো রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের জাতীয় ফুটবল দলকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং তারা মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিজুয়ানায় নিজেদের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছে।
চলমান এই বৈষম্যমূলক নীতির ফলে ইরানি ফুটবলারদের খেলা সম্পন্ন করার জন্য প্রতি ম্যাচের আগে মেক্সিকো থেকে বিমানে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস বা অন্যান্য ভেন্যুতে যাতায়াত করতে হচ্ছে এবং ম্যাচ শেষেই আবার মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হচ্ছে। গত জুনের শুরুতে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ইরানের মূল খেলোয়াড়দের শেষ মুহূর্তে মার্কিন ভিসা দেওয়ার কথা নিশ্চিত করলেও দলটির মূল কারিগরি ও প্রশাসনিক কর্মীদের একটি বড় অংশকে এখনো ভিসা দেওয়া হয়নি। এই কারণে ইরানের জাতীয় দলের কোচ আমির গ্যালেনোই বারবার এই চরম বৈষম্যমূলক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং স্পষ্ট করে বলেছেন যে তাদের দলকে এমন সব কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে যা বিশ্বের অন্য কোনো ফুটবল দলকে সহ্য করতে হয়নি।
লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ইরানের দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি শূন্য শূন্য গোলে ড্র হওয়ার পর ইরানি খেলোয়াড়রা তাদের ড্রেসিংরুমে একটি আবেগঘন হাতে লেখা চিঠি রেখে গেছেন যা বিশ্ব গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রাচীন পারস্য থেকে শুরু করে আধুনিক সভ্য ইরানের গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে দলটি লস অ্যাঞ্জেলেসের সাধারণ মানুষের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে এবং বলেছে যে তারা চরম প্রতিকূলতার মাঝেও সম্মানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছে। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার প্রবাসী ইরানি সমর্থক এই সময় তাদের জাতীয় সংগীতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং ইসলামি বিপ্লবের পূর্ববর্তী প্রতীক সংবলিত বিশেষ পতাকা প্রদর্শন করে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী এবং ক্রীড়া বিশ্লেষকরা ফিফার এই বৈশ্বিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে মার্কিন সরকারের এমন কট্টর জাতীয়তাবাদী নীতির কড়া সমালোচনা করেছেন এবং একে বিশ্ব ফুটবলের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনার পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছেন। আফ্রিকার স্বাধীন থিংক ট্যাংক `আফ্রিকা ইজ এ কান্ট্রি` এর পরিচালনা বিষয়ক পরিচালক বোইমা টাকার এই বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন যে ক্রীড়া ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের সবচেয়ে বড় এই মঞ্চটি এখন মার্কিন সীমান্ত নীতি ও ভূ-রাজনীতির নোংরা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অনেক ফুটবলপ্রেমী অভিযোগ করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার নামে সাধারণ ভক্তদের ওপর যে ধরনের হয়রানি চালানো হচ্ছে তা অত্যন্ত অপমানজনক এবং এর ফলে হাজার হাজার টিকিটধারী আন্তর্জাতিক দর্শক স্টেডিয়ামে পৌঁছাতে পারছেন না।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অজুহাতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এবং স্বরাষ্ট্র বিভাগ এই কড়াকড়িকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে দাবি করলেও সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের মূল সৌন্দর্যকে ম্লান করে দেওয়ার সমান। যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন প্রশাসনের এই অনমনীয় ভিসা নীতির কারণে আগামী দিনগুলোতে বিশ্বকাপ ২০২৬ এর বাকি ম্যাচগুলোতে দর্শক সমাগম কেমন হবে এবং ফিফা ভবিষ্যতে এই ধরনের রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাষ্ট্রকে এককভাবে আয়োজক করার ক্ষেত্রে কোনো নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করবে কি না। ইরান দল তাদের পরবর্তী ও চূড়ান্ত গ্রুপ পর্বের ম্যাচে সিয়াটলে মিসরের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে যেখানে জয় লাভ করতে পারলে তারা নকআউট পর্বে নিজেদের জায়গা সুনিশ্চিত করতে পারবে বলে রয়টার্স তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
