যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে সোমবার অনুষ্ঠিত ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে শক্তিশালী ফ্রান্স ইরাককে ৩-০ গোলে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং দিনাজপুর টিভির যৌথ ক্রীড়া প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মাঠের এই দাপুটে এবং একচেটিয়া জয়ের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসির অনন্য বিশ্বরেকর্ড নিয়ে নিজের অত্যন্ত স্পষ্ট ও সোজাসাপ্টা মনোভাব প্রকাশ করেছেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফরাসি এই ফরোয়ার্ড সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি এই মুহূর্তে অন্য কারও ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে মোটেও ভাবছেন না এবং তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ কেবল নিজের দলের জয় নিশ্চিত করার ওপর নিবদ্ধ রয়েছে। ইরাকের বিরুদ্ধে মাঠে নামার ঠিক আগের রাতে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত জোড়া গোল করে বিশ্বমঞ্চে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
এই ঐতিহাসিক ম্যাচটিতে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের জার্সিতে নিজের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার গৌরবময় মাইলফলক স্পর্শ করেছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই তরুণ তারকা ফুটবলার। একই সঙ্গে চলতি বিশ্ব আসরের প্রথম দুই ম্যাচেই জোড়া গোল করার মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোল সংখ্যাকে ১৬-তে নিয়ে গেছেন তিনি, যা তাঁকে জার্মানির সাবেক কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসার ঐতিহাসিক রেকর্ডের পাশে বসিয়েছে। এই তালিকায় ফরাসি অধিনায়ক বর্তমানে মেসির চেয়ে মাত্র দুটি গোলে পিছিয়ে আছেন এবং তিনি ফুটবল ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর কীর্তি গড়লেন। নিজের বর্তমান শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলার সময় তিনি উল্লেখ করেন যে গত জানুয়ারি মাসে তিনি একটি বড় ধরনের ইনজুরিতে পড়েছিলেন যা তাঁর খেলায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। তবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত একটি মৌসুম কাটানোর পর তিনি মানসিকভাবে নিজের সেরা ছন্দে ফেরার লড়াই চালিয়ে গেছেন যাতে বিশ্বমঞ্চে দেশের জন্য নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতে পারেন।
আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ার আকাশ জুড়ে প্রবল বজ্রঝড় এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রথমার্ধের খেলার পর ম্যাচটি দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ স্থগিত রাখতে হয়েছিল। সেই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর অপেক্ষার নাটকীয় অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে ফরাসি অধিনায়ক জানান যে ড্রেসিংরুমে প্রায় দুই ঘণ্টার মতো বন্দি থেকে পুনরায় ম্যাচের মূল আবহে ফেরা এবং খেলার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখা ছিল তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি পরীক্ষা। ফিফার আবহাওয়া প্রোটোকলের কারণে ম্যাচটি দীর্ঘায়িত হওয়ায় খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক শক্তির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন। পরিস্থিতি বেশ জটিল ও চ্যালেঞ্জিং হলেও দিনশেষে দল পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পেরেছে এবং এটিই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয়।
ম্যাচের বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে শুরু থেকেই ফরাসিরা ইরাকি রক্ষণভাগের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং ম্যাচের ১৪তম মিনিটে মাইকেল অলিসের চমৎকার পাস থেকে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে ফ্রান্সকে প্রথম সফলতা এনে দেন এমবাপ্পে। এরপর ম্যাচের ৫৪তম মিনিটে ইরাকি ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষকের এক মারাত্মক ভুলের সুযোগ নিয়ে ওসমানে দেম্বেলের সহায়তায় নিজের দ্বিতীয় এবং দলের পক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করেন এই ফরাসি অধিনায়ক। এর ঠিক ১২ মিনিট পর ওসমানে দেম্বেলে নিজেই ম্যাচের তৃতীয় গোলটি করে ফ্রান্সের বড় জয় সুনিশ্চিত করেন এবং ইরাককে ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে দেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো আগামী ম্যাচগুলোতে ফ্রান্স এই আক্রমণাত্মক ধারা বজায় রেখে তাদের শিরোপা ধরে রাখার মিশন কতটা সফল করতে পারবে। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এই জয়ের মাধ্যমে ছয় পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ আই-এর শীর্ষস্থান মজবুত করেছে এবং তাদের পরবর্তী ম্যাচ নরওয়ের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্বকাপের এই আসরে ফ্রান্সের এমন চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের পর ফুটবল বোদ্ধারা মনে করছেন যে এমবাপ্পে খুব দ্রুতই মেসির রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়বেন। তবে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম তাঁর অধিনায়কের ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে রেকর্ড গড়া বা ভাঙা ফুটবল খেলার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মাত্র এবং এমবাপ্পের সেই যোগ্যতা রয়েছে। ইরাকের বিরুদ্ধে এই বড় জয়ের পর ফরাসি শিবিরে এখন স্বস্তির হাওয়া বইছে এবং দলের প্রতিটি সদস্য নকআউট পর্বের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছেন। ফুটবল প্রেমীরাও এখন উন্মুখ হয়ে আছেন এই ফরাসি তারকার পা থেকে আরও চমৎকার সব গোল দেখার জন্য যা এবারের বিশ্বকাপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
