মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩

দলের শীর্ষ নেতৃত্ব হারাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২২, ২০২৬, ১১:৫৫ পিএম

দলের শীর্ষ নেতৃত্ব হারাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব সাংগঠনিক পরিবর্তনের দাবি তুলে দলটির বর্তমান প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন একদল বিদ্রোহী বিধায়ক ও কাউন্সিলর, রাজ্য গণমাধ্যম ও দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। সোমবার অঞ্চলের নিউ টাউনের একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এক বিশেষ জরুরি বৈঠকে এই দাবি উত্থাপন করা হয়। বিধানসভার অভ্যন্তরীণ বিরোধী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই গোপন সভায় দলটির একটি বড় অংশ উপস্থিত হয়ে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। এই ঘটনার ফলে রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে এক বিশাল আলোড়ন ও গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

উক্ত বিশেষ রাজনৈতিক বৈঠকে দলটির প্রায় ষাট জন নির্বাচিত বিধায়ক এবং কলকাতা পুরসভার অন্তত সত্তর জন কাউন্সিলর সশরীরে উপস্থিত ছিলেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সর্বভারতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন না করার অজুহাতে এই জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। ২০২২ সালে দলটির সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়েছিল এবং দীর্ঘ চার বছর ধরে নতুন কোনো কমিটি না হওয়ায় দলের ভেতরে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল। বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এক উন্মুক্ত ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয় এবং হাওড়ার প্রবীণ বিধায়ক অরূপ রায়কে সর্বসম্মতভাবে দলের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।

নতুন ঘোষিত এই সাংগঠনিক কাঠামোতে সহসভাপতি হিসেবে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে যাদের মধ্যে ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, রথিন ঘোষ এবং সাবিনা ইয়াসমিন অন্যতম। একই সাথে নতুন এই কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান এবং সন্দীপন সাহাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং কোষাধ্যক্ষ হিসেবে আখরুজ্জামান আনসারির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। দলের সমস্ত আর্থিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন নিরীক্ষক দল নিয়োগের সিদ্ধান্তও এই বৈঠক থেকে গৃহীত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত দলটির ভেতরে একটি নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে পারে এবং দীর্ঘদিনের একক কর্তৃত্বের অবসান ঘটাতে পারে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই বিদ্রোহী কমিটির আইনি বৈধতা কতটা শক্তিশালী এবং নির্বাচন কমিশনের খাতায় এই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি পাবে কি না। মূল ধারার দলীয় নেতারা অবশ্য এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এক্তিয়ার বহির্ভূত বলে কঠোর সমালোচনা করছেন। বেলেঘাটা কেন্দ্রের প্রবীণ তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ দলীয় প্রধানের কালীঘাটের বাসভবনে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান যে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে একে অপরের সমার্থক। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে দলের বর্তমান নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো অনুযায়ী এই বিদ্রোহী নেতাদের এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা কমিটি গঠন করার বিন্দুমাত্র আইনগত এক্তিয়ার নেই।

পশ্চিমবঙ্গের এই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা আগামী দিনগুলোতে রাজ্য সরকারের স্থিতিশীলতার ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মাঝে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে একচ্ছত্র ক্ষমতায় থাকা একটি দলের অভ্যন্তরে এমন উন্মুক্ত বিদ্রোহ এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এই সাংগঠনিক বিভক্তি শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায় নাকি দলের ভেতরেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয় তা এখনো নিশ্চিত নয়। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীরা এখন গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছেন যে এই ক্ষমতার লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়।

banner
Link copied!