রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব রক্ষায় উনরাওয়ার অপরিহার্য অবদান

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৮, ২০২৬, ১১:২৪ পিএম

ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব রক্ষায় উনরাওয়ার অপরিহার্য অবদান

জন্মের পর থেকেই জাতিসংঘ ফিলিস্তিনি শরণার্থী ত্রাণ ও কর্মসংস্থান সংস্থা তথা উনরাওয়ার সঙ্গে আমার জীবন ও অস্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। জন্ম নেওয়ার কয়েকমাসের মধ্যেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উনরাওয়ার চিকিৎসকদের কাছ থেকে আমি আমার জীবনের প্রথম টিকাগুলো গ্রহণ করেছিলাম। সেই সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সংস্থাটি আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে বিশ্বস্ত এক ছায়ার মতো পাশে রয়েছে। একজন ফিলিস্তিনি শরণার্থী হিসেবে এটি আমার আত্মপরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

যখন সংবাদমাধ্যমে মার্কিন কর্মকর্তাদের এমন বিবৃতি পড়তে হয় যেখানে গাজায় উনরাওয়া নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়, কিংবা যখন জানতে পারি যে ইসরায়েল অবরুদ্ধ পূর্ব জেরুজালেমে উনরাওয়ার একটি কম্পাউন্ডে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন হৃদয়ে তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হয়। ফিলিস্তিনিদের বাইরে অন্য কারও পক্ষে এটি অনুধাবন করা কিছুটা কঠিন হতে পারে যে উনরাওয়ার ওপর এই ধারাবাহিক আক্রমণ কেন আমাদের জন্য এত সংবেদনশীল একটি বিষয়। বিশ্বের বাকি অংশের কাছে এটি কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে সেবা প্রদানকারী একটি মানবিক সংস্থা মাত্র, কিন্তু আমাদের অস্তিত্বের জন্য এর গুরুত্ব এর চেয়ে অনেক বেশি গভীর।

আজ থেকে বায়ান্ন বছর আগে গাজা সিটির দারাজ এলাকার একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে উনরাওয়ার একজন নার্স যখন আমার দাদাকে টিকার সুচ ফুটিয়েছিলেন, তখন থেকেই আমাদের পরিবারের সঙ্গে এই সংস্থার নাড়ির টান তৈরি হয়েছিল। ১৯৫০ সালের সেই সময়ে উনরাওয়ার কর্মীরা আমার দাদা আহমেদ আবু আয়েশাকে খুঁজে বের করেছিলেন, যাঁর বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। এর দুই বছর আগে উনিশশো আটচল্লিশ সালের নাকবার সময় জায়নবাদী মিলিশিয়াদের আগ্রাসনের মুখে আমার দাদা ও তাঁর পরিবার বীর আল-সাবো শহর থেকে পায়ে হেঁটে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমার প্রপিতামহ ইব্রাহিম আবু আয়েশা একজন পরিচিত গবাদি পশু ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তিনি ভেবেছিলেন তাঁরা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবেন।

সেই আশায় তিনি ঘরের দরজা বন্ধ করে সম্পত্তির দলিল, জন্মসনদ, সমস্ত গবাদি পশু ও ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র পেছনে ফেলে এসেছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি এবং পরিবারের কাছে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করার মতো কোনো দাপ্তরিক কাগজপত্র অবশিষ্ট ছিল না। সম্প্রতি আমার দাদা আমাকে স্মরণ করে বলছিলেন যে শরণার্থী শিবিরে পৌঁছানোর পর তাঁদের কাছে কোনো নিবন্ধিত জন্মতারিখ বা পরিচয়পত্র ছিল না। উনরাওয়ার কর্মীরা এগিয়ে এসে তাঁর জন্য একটি বিশেষ জন্মসনদ তৈরি করে দেন, যেখানে একটি আনুমানিক জন্মতারিখ লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল যাতে তিনি সমাজে একটি স্বীকৃত পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।

উনরাওয়ার দেওয়া সেই সনদের মাধ্যমেই পরবর্তীতে ষোলো বছর বয়সে আমার দাদা মিশ্রি কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা একটি আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তবে কেবল পরিচয়পত্র প্রদানই নয়, বরং শরণার্থী পরিবারগুলোর জন্য একটি আইনি ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উনরাওয়ার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত যুগান্তকারী। সংস্থাটির পক্ষ থেকে একটি পারিবারিক নিবন্ধন কার্ড প্রদান করা হতো, যা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের একমাত্র আইনি প্রমাণ হিসেবে কাজ করত এবং এর মাধ্যমেই তারা সংস্থাটির বিভিন্ন সেবা পাওয়ার অধিকার লাভ করত।

পরবর্তী মাসগুলোতে উনরাওয়ার পক্ষ থেকে তাঁবু স্থাপন করে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটানো শত শত হাজার হাজার শরণার্থীর মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করা হয়। ধীরে ধীরে ঐতিহাসিক গাজা শহরের চারপাশের মরুভূমি এলাকাগুলোকে সুসংগঠিত শরণার্থী শিবিরে রূপান্তর করা হয়, যার মধ্যে উত্তরে জাবালিয়া ও শাতি, মধ্য অঞ্চলে নুসিরাত, বুরাইজ, মাগাজি এবং দেইর আল-বালাহ এবং দক্ষিণে খান ইউনিস ও রাফা অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিটি শিবিরে স্কুল ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করে শরণার্থীদের জন্য একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।

আমার দাদাও উনরাওয়ার পরিচালিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাও একই সংস্থার অধীনে শিক্ষালাভ করেন। আমাদের প্রজন্ম যখন স্কুলের আঙিনায় পা রাখার বয়স হলো, তখন গাজা উপত্যকাজুড়ে উনরাওয়া প্রায় দুইশটি বিদ্যালয় পরিচালনা করছিল। আমার বড় দুই বোন যখন স্কুল পোশাকে ক্লাসে যেত, তখন আমিও তাদের মতো পড়ার টেবিলে বসার জন্য গভীর আগ্রহ প্রকাশ করতাম। আমি তাদের নীল ও সাদা রঙের স্কুল ইউনিফর্ম গায়ে জড়িয়ে ঘরের ভেতরে ঘুরে বেড়াতাম এবং পরিবারের সবাই আমার সেই কৌতূহল দেখে আনন্দ পেত।

অবশেষে যখন আমার বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হলো, তখন আমার জীবনেও সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি এল এবং আমি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করলাম। আমার মা আমাকে সঙ্গে করে একটি উনরাওয়ার চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান এবং সেখানে প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ করার ব্যবস্থা করেন। নীল ও সাদা রঙে রাঙানো সেই ভবনের প্রতিটি কোণ আজও আমার স্মৃতিতে স্পষ্টভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমার মায়ের হাতে থাকা সেই পারিবারিক নিবন্ধন কার্ডটি দেখিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর দৃশ্যটি আমার মনের মণিকোঠায় চিরকাল সংরক্ষিত থাকবে।

টিকা গ্রহণের পর আমরা নতুন স্কুল পোশাক কিনতে বাজারে গেলাম, যেখানে নীল ও সাদা ডোরাকাটা একটি সুন্দর পোশাক নির্বাচন করা হয়েছিল। দারাজ কো-এডুকেশনাল স্কুল বি-তে আমার প্রথম ক্লাসে যোগদানের সেই রোমাঞ্চকর সকালটির কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। ক্লাসের প্রথম দিনেই আমাদের হাতে খাতা, কলম এবং স্কুল ব্যাগ তুলে দেওয়া হয়েছিল, যার প্রতিটিতে একই ঐতিহ্যবাহী নীল ও সাদা লোগো মুদ্রিত ছিল। স্কুলের প্রতিটি বিরতিতে আমাদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের সুব্যবস্থা করা হতো এবং প্রতি সেমিস্টারে শ্রেণিকক্ষের ভেতর নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হতো যা আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত সহায়ক ছিল।

শরণার্থী হওয়ায় আমাদের তৎকালীন সময়ে গাজার সাধারণ মূলধারার বিদ্যালয়গুলোতে পড়ার অনুমতি ছিল না, তবে উনরাওয়ার চমৎকার শিক্ষাব্যবস্থার কারণে আমাদের শিক্ষাজীবনে কোনো ঘাটতি পড়েনি। এই বিদ্যালয়গুলো থেকেই আমি ইংরেজি ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করি এবং বিশ্ববাসীর কাছে ফিলিস্তিনি জনগণের বঞ্চনার গল্প তুলে ধরার সাহস সঞ্চয় করি। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ এবং চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও গাজাকে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ স্বাক্ষরতার হারসম্পন্ন অঞ্চলে পরিণত করার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিল এই সংস্থাই।

শিক্ষা ছাড়াও উনরাওয়ার পক্ষ থেকে আমাদের বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হতো, যার মধ্যে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ল্যাব টেস্ট এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতিটি শরণার্থী পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট কুপন প্রদান করা হতো, যার মাধ্যমে আটা, চাল, চিনি, দুধ, ডাল এবং রান্নার তেল সংগ্রহ করা যেত। গাজার হাজার হাজার ফিলিস্তিনি যুবকের জন্য উনরাওয়া কর্মসংস্থানের একটি অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করেছিল এবং তাদের জীবিকা নির্বাহের পথ সুগম করেছিল।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সংস্থার সরব উপস্থিতি আমাদের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে একেবাবে মিশে গেছে। আমার দাদা-দাদি আজও তাঁদের আদি নিবন্ধন কার্ডটি সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছেন, যা তাঁদের অধিকার ও শেকড়ের অকাট্য দলিল। উনরাওয়ার স্কুলগুলোতে আমাদের দেশের প্রতি ভালোবাসা, দেশপ্রেম এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রথম পাঠ শেখানো হয়েছিল। একটি অন্যায্য সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমাদের মাতৃভূমি কেড়ে নেওয়ার অপরাধের কথা এই সংস্থাটি প্রতিনিয়ত বিশ্ববাসীর স্মরণ করিয়ে দেয়।

এই সংস্থাটির অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকার ও প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এর স্থায়ী সমাধান করা নৈতিক দায়িত্ব। গাজায় সংঘটিত সাম্প্রতিক ধ্বংসযজ্ঞের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে চায়, তবে উনরাওয়াকে টিকিয়ে রাখা এবং এর কার্যক্রমকে আরও জোরদার করা অপরিহার্য। ফিলিস্তিনি জনগণ নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে এবং ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষায় আমৃত্যু লড়াই চালিয়ে যাবে।

banner
Link copied!