দক্ষিণ সোমালিয়া থেকে পালিয়ে আসা বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, আল-শাবাবের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় বিমান হামলা তীব্র করে মার্কিন বাহিনী নারী ও শিশুদের তীব্র মৌসুমী বন্যার মুখে আটকে ফেলেছে। জিলিব শহরের আশপাশে চলমান সামরিক অভিযানের কারণে সাধারণ মানুষ উপচে পড়া জুবা নদীর তীরের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে সোমবার বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে।
শহরটি থেকে পালিয়ে আসা ছয় সন্তানের জননী আইনি আলী জানিয়েছেন, ওই এলাকায় ড্রোনগুলো সার্বক্ষণিক টহল দেয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুও মারা যাচ্ছে এবং ধ্বংসযজ্ঞের পরিধি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামের বাসিন্দা আশো ওমর জানান, অব্যাহত বোমা হামলার কারণে চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এতে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
জিলিব শহরটি মূলত আল-শাবাব জঙ্গিদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যারা সোমালিয়ার প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। বাহিরের বিশ্বের সঙ্গে এলাকাটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। পূর্ব আফ্রিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে চলা এক আইনি জটিল সংঘাতে এই অঞ্চলের রাস্তায় রাস্তায় মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ড তাদের অভিযানের বিষয়ে কোনো ধরনের নিরাপত্তাজনিত তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। জুবা প্লাবনভূমির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারীরা জানিয়েছেন, এই সামরিক কৌশল দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো আবহাওয়াকে কাজে লাগানোর মতো এক পরিস্থিতির তৈরি করেছে। এই অঞ্চল পর্যবেক্ষণকারী একটি সূত্র জানিয়েছে, এই অভিযানের কারণে সাধারণ মানুষ নদীর কাছাকাছি যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যা মূলত আবহাওয়াকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে লোকজনকে বন্যাপ্রবণ এলাকায় ঠেলে দেওয়ার শামিল।
এর আগে ২০২৩ সালের এল নিনো মৌসুমে সোমালিয়ায় ১২ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বাড়াতে সামরিক পরিকল্পনাকারীরা মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমের দূরসংবেদন ম্যাপিং ডেটা ব্যবহার করছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। ড্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক জেথ্রো নরম্যান জানিয়েছেন, মানুষের ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা মানবিক ম্যাপিং ডেটা যদি প্রাণহানির কাজে ব্যবহার করা হয়, তবে তা হবে তার মূল উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
জলবায়ুর উপাদানগুলোকে সামরিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। আফ্রিকা কমান্ডের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের কমান্ড বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না, লোকজনকে বাস্তুচ্যুত করার জন্য অভিযান চালায় না এবং আবহাওয়া বা বন্যাকে যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবেও ব্যবহার করে না। তিনি আরও যোগ করেন, মার্কিন বাহিনী আইনসম্মত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় এবং বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সাধ্যমতো সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
জুবা নদী অববাহিকায় চরম আবহাওয়ার প্রভাব পড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্কবার্তা দিয়েছে। আসন্ন তীব্র বন্যা নিয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি সতর্কবার্তা জারি করেছে। স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, ভুট্টা ও জোয়ারের খেত ইতিমধ্যেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
জুবাল্যান্ডের বাস্তুচ্যুত মানুষবিষয়ক কমিশনার আলী আদন আলী উদ্ধারকারী নৌকার তীব্র সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, হাজার হাজার মানুষ নদীর পূর্ব তীরে আটকা পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং কিসমায়োতে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর মতো কোনো মাধ্যম তাদের হাতে নেই। ২০২৩ সালের বন্যায় ১৯ হাজার মানুষ এক সপ্তাহ ধরে খাবার ছাড়া আটকা পড়েছিল এবং বিগত বছরগুলোর তুলনায় বর্তমান সময়ে ত্রাণের জন্য বরাদ্দ তহবিলও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
বাড়তে থাকা পানির বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো খুবই অপ্রতুল। নদীর ধারে যে মাটির বাঁধগুলো তৈরি করা হয়েছিল তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় এবং আল-শাবাব কর্তৃপক্ষও বন্যার বিষয়ে কোনো ধরনের প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে বেসামরিক হতাহতের ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
