আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিল বা সিএআইআর ফ্লোরিডায় তাদের সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত করেছে। অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা নতুন একটি আইন কার্যকর করার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা নির্দিষ্ট কোনো সংস্থাকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ দেয়। মানবাধিকার সংস্থাটি এবং ফ্লোরিডার রাজ্য কর্তৃপক্ষ উভয় পক্ষই এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ফ্লোরিডার রিপাবলিকান গভর্নর রন ডিসান্টিস এই বিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। নতুন এই আইন অনুযায়ী গভর্নর, মন্ত্রিসভা এবং অঙ্গরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধানের হাতে বিশেষ ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চরমপন্থী কার্যক্রমে জড়িত যেকোনো সংস্থাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব।
এমনকি কোনো সংস্থাকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে বিলুপ্ত করা এবং সরকারি অনুদান স্থগিত করা হতে পারে। পাশাপাশি কোনো দেশীয় বা বিদেশি সন্ত্রাসী সংস্থাকে সমর্থনকারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে এই আইনে।
সম্প্রতি একজন যুক্তরাষ্ট্রীয় বিচারক নাগরিক অধিকার সংগঠনটির করা একটি আবেদন খারিজ করে দেন। ওই আবেদনে অঙ্গরাজ্যের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্তটি বাতিলের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে সংগঠনটি এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
বিচারক নতুন এই আইনটিকে অভিনব হিসেবে বর্ণনা করলেও মত দিয়েছেন যে, সংগঠনটি এটি প্রমাণ করতে পারেনি যে এই তালিকাভুক্তি কোনো অপরাধমূলক শাস্তি। রায় ঘোষণার পর সিএআইআর-এর ফ্লোরিডা শাখার ওয়েবসাইটে একটি নোটিশ প্রকাশ করা হয়।
সেখানে জানানো হয়, গভর্নর রন ডিসান্টিস এবং অন্যান্য রাজ্য কর্মকর্তার ভিত্তিহীন ও অসাংবিধানিক পদক্ষেপের কারণে তারা কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছেন। ফ্লোরিডার এই নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী আইনের প্রয়োগ তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে আদালতের রায় এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন গভর্নর রন ডিসান্টিস ও ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমিয়ার। চরমপন্থা দমন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই আইন একটি শক্তিশালী কাঠামো বলে দাবি করেছেন গভর্নর।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবং বেশ কয়েকটি রিপাবলিকান-শাসিত অঙ্গরাজ্য বামপন্থী ও ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। সে সময় ওই গোষ্ঠীগুলোকে ইহুদিবিদ্বেষী, দেশবিরোধী ও চরমপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা গেছে।
নতুন এই আইনকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। নাগরিক অধিকার রক্ষাকারীদের মতে, এই আইন মানুষের বাকস্বাধীনতা খর্ব করে এবং নির্দিষ্ট মতামত, প্রতিবাদ কিংবা সংঘবদ্ধ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে।
সমালোচকদের অভিযোগ, রিপাবলিকান কর্মকর্তারা গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের বিরুদ্ধে করা শান্তিপূর্ণ সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকে চরমপন্থার সমর্থন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন এবং পেন আমেরিকা এই আইনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পেন আমেরিকা সতর্ক করে বলেছে যে, এসব নিয়মের কারণে মারাত্মক এক ভীতি তৈরি হয়েছে যা মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতাকে অবরুদ্ধ করে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘটা বিভিন্ন বিদ্বেষমূলক ঘটনা নথিবদ্ধ করে সিএআইআর। সংস্থাটির মতে, ক্রমবর্ধমান ইসলামভীতির পেছনে ফেডারেল পর্যায়ের অভিবাসন নীতি এবং ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ দমনের মতো পদক্ষেপগুলো দায়ী।
গত বছরের শেষ দিকে গভর্নর রন ডিসান্টিস এক নির্বাহী আদেশে এই নাগরিক অধিকার সংস্থাকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। যদিও সে সময় আদালতের হস্তক্ষেপে সেই পদক্ষেপ আটকে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার কর্মীরা মুসলমানদের লক্ষ্য করে চলা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ও পদক্ষেপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
