কোরবানি কেবল একটি উৎসব নয়, এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় সম্পদ উৎসর্গ করার এক অনন্য ইবাদত। জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ নির্দিষ্ট কিছু গৃহপালিত পশু জবাই করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ এই বিধান পালন করে থাকে। তবে যেকোনো প্রাণী জবাই করলেই কোরবানি হবে না। ইসলামের শরীয়তে কোরবানির পশুর প্রজাতি, বয়স এবং শারীরিক সুস্থতা নিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাগুলো পালন করা কেবল নিয়ম নয়, বরং এটি কোরবানির গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম শর্ত।
ইসলামি আইন বা ফিকহ শাস্ত্র অনুযায়ী, কোরবানির পশু হতে হবে `বাহিমাতুল আন’আম` বা গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, `আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে` (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৩৪)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, বন্য কোনো প্রাণী দিয়ে কোরবানি করা সম্ভব নয়।
প্রধানত তিন শ্রেণির প্রাণী কোরবানি করা যায়: উট, গরু (এর মধ্যে মহিষও অন্তর্ভুক্ত) এবং ছাগল (যার মধ্যে ভেড়া ও দুম্বাও পড়ে)। এর বাইরে অন্য কোনো প্রাণী যেমন হরিণ, নীলগাই বা বন্য শুকর দিয়ে কোরবানি করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। আবার ঘোড়া খাওয়া জায়েজ হওয়া নিয়ে মতভেদ থাকলেও এটি দিয়ে কোরবানি করা যাবে না বলে অধিকাংশ আলেম একমত। হাঁস-মুরগি বা অন্য কোনো পাখির কোরবানির তো প্রশ্নই আসে না।
পশুর বয়সের বিষয়টি এখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল। উটের বয়স অন্তত ৫ বছর পূর্ণ হতে হবে। গরু বা মহিষের বয়স হতে হবে কমপক্ষে ২ বছর। আর ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১ বছর বয়স হওয়া আবশ্যক। তবে ভেড়া বা দুম্বার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ছাড় রয়েছে—যদি সেটি ৬ মাস বয়সের হয় কিন্তু দেখতে এতই হৃষ্টপুষ্ট যে ১ বছরের ভেড়ার পালের ভেতর ছেড়ে দিলে আলাদা করা যায় না, তবে সেটি দিয়ে কোরবানি করা যাবে। তবে ছাগলের ক্ষেত্রে ১ বছর পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। বয়সের এই হিসাবটি মূলত পশুর দাঁত দেখে নিশ্চিত হওয়া হয়, যা খামারি ও ক্রেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতি।
পশুর শারীরিক সুস্থতা ও ত্রুটির বিধান
কোরবানির পশুর সুস্থতা নিশ্চিত করা সুন্নাহর অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বদা সর্বোত্তম পশুটি কোরবানি করতেন। সহীহ হাদিসে ৪ ধরনের ত্রুটিযুক্ত প্রাণীর কোরবানিকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল-বারা বিন আযিব (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সা.) বলেছেন—`চারটি প্রাণী কোরবানির জন্য জায়েজ নয়: যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, যে পশুটি স্পষ্টভাবে অসুস্থ, যার খোঁড়া ভাব সুস্পষ্ট এবং যে পশুটি এতই কৃশ যে তার হাড়ে মজ্জা নেই` (সুনানে আবু দাউদ, ২৮০২)।
এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে ফিকহবিদগণ আরও কিছু ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন, যদি পশুর কান বা লেজের অর্ধেকের বেশি অংশ কাটা থাকে, তবে সেটি কোরবানি করা অনুচিত। যে পশুর একটি শিংও নেই বা গোড়া থেকে শিং ভেঙে গেছে, তা দিয়ে কোরবানি হবে না। তবে জন্মগতভাবে শিং না থাকলে কোনো সমস্যা নেই। আবার দাঁতহীন পশু যদি ঘাস খেতে না পারে, তবে সেটিও কোরবানির অযোগ্য। মূল কথা হলো, আল্লাহর রাস্তায় যে পশুটি দেওয়া হচ্ছে, তা যেন যাবতীয় খুঁত থেকে মুক্ত থাকে। কারণ এটি মূলত বান্দার অন্তরের তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ।
মাংসের জন্য নয়, বরং ইবাদতের পূর্ণতার জন্য পশু নির্বাচনের সময় আমাদের সতর্ক হতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ কম দামে দুর্বল বা রোগা পশু খোঁজে। এটি কোরবানির মূল স্পিরিটের পরিপন্থী। পশুটি যেন দেখার মতো সুন্দর এবং শক্তিশালী হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এছাড়া অন্ধ বা এক চোখ নষ্ট, কান কাটা বা ছিদ্রযুক্ত, লেজ কাটা—এমন সব পশু এড়িয়ে চলাই মুমিনদের বৈশিষ্ট্য।
অংশীদারিত্ব ও অন্যান্য মাসায়েল
কোরবানির পশুর সংখ্যা এবং অংশীদারিত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কেবল একজনের পক্ষ থেকেই কোরবানি করা যায়। তবে একটি উট বা গরু সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি মিলে কোরবানি দিতে পারেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—`আমরা রাসূল (সা.)-এর সাথে হজের সময় একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছি` (সহীহ মুসলিম, ১৯৬৩)। এখানে শর্ত হলো, প্রত্যেক অংশীদারের নিয়ত থাকতে হবে ইবাদতের, কেবল মাংস পাওয়ার উদ্দেশ্যে যেন কেউ শরিক না হয়।
কোরবানির পশু কেনার পর যদি কোনো কারণে সেটি হারানো যায় বা মারা যায়, তবে ধনী ব্যক্তির জন্য পুনরায় পশু কেনা ওয়াজিব। আর গরিব মানুষের জন্য যার ওপর কোরবানি ফরজ ছিল না কিন্তু শখ করে কিনেছেন, তার ক্ষেত্রে পুনরায় কেনা ওয়াজিব নয়। গর্ভবতী পশুর কোরবানি করাও বৈধ, তবে প্রসবের সময় খুব কাছে থাকলে তা এড়িয়ে চলাই ভালো। জবাইয়ের পর যদি ভেতরে জীবিত বাচ্চা পাওয়া যায়, তবে সেটিও জবাই করতে হবে।
পরিশেষে, কোরবানি কেবল একটি রীতি নয়, বরং এটি ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের স্মৃতি যা আমাদের শেখায় আল্লাহর হুকুমে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে। তাই পশুর প্রজাতি, বয়স ও সুস্থতার এই নিয়মগুলো নিখুঁতভাবে পালন করা আমাদের ইবাদতকে সার্থক করে তুলবে। ত্রুটিমুক্ত এবং সুন্দর পশু নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা যেন মহান আল্লাহর দরবারে নিজেদের তাকওয়ার স্বাক্ষর রাখতে পারি। এটিই হোক আমাদের আগামী কোরবানির মূল লক্ষ্য।
