তুরস্কে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সম্মেলনে যোগ দেননি আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ। গত শুক্রবারের এই অনুপস্থিতি দুই ঐতিহাসিক মিত্র দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে নানা জল্পনা উসকে দিয়েছে।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই দুটি দেশ প্রায়ই তাদের সম্পর্ককে এক জাতি, দুই রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। ফলে অর্গানাইজেশন অব তুর্কিক স্টেটস বা তুর্কিক রাষ্ট্র সংগঠনের এই বৈঠকটিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছিলেন পর্যবেক্ষকরা।
আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আজারবাইজানের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেইহুন বায়রামভ। তবে আজারবাইজানি গণমাধ্যমের দাবি, পূর্বনির্ধারিত ব্যস্ততার কারণেই সম্মেলনে অনুপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট আলিয়েভ।
এই সংস্থায় তুরস্ক ছাড়াও আজারবাইজান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও উজবেকিস্তান সদস্য হিসেবে রয়েছে। সরকারপন্থী আজারনিউজ পোর্টালের বিশ্লেষক ফারমান আইদিন বাকুর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রতিকূল প্রচারণার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
ওই বিশ্লেষক লিখেছেন যে কোনো ঘনিষ্ঠ অংশীদারের কাছ থেকে অবমূল্যায়ন বা শত্রুভাবাপন্ন আচরণ পেলে তা সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। তার মতে, শীর্ষ সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি একটি পরিষ্কার কূটনৈতিক বার্তা, যার মূল কথা হলো অংশীদারত্বে পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকা আবশ্যক।
তুরস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ও প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বাকুর একটি সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করার পর মূলত এই উত্তেজনার শুরু হয়। গত সেপ্টেম্বর মাসে আজারবাইজানের স্কুলগুলোতে ছাত্রীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও ইসলামিক হেড স্কার্ফ বা হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা হয়।
এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে তুরস্কের মাটিতে আজারবাইজানি কূটনৈতিক মিশনের সামনে ছোটোখাটো বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়। অথচ ২০০৩ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রেসিডেন্ট এরদোগানের প্রশাসন তুরস্কে হিজাবের ওপর থাকা দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক অভিযানের বিষয়ে তুরস্কের কড়া সমালোচনার মুখে বাকুর সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও দূরত্ব তৈরি হয়। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ আজারবাইজান এই প্রকাশ্য সমালোচনাকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
যদিও হিজাব নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তুর্কি সরকার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই আজারবাইজান সরকার তুর্কিপন্থি একটি ছোট বিরোধী দলের নেতাসহ ত্রিশ জনের বেশি তুর্কি নাগরিকের দেশটিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে।
তুর্কি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সম্মেলন শুরুর আগেই প্রেসিডেন্ট এরদোগান টেলিফোনে ব্যক্তিগতভাবে আলিয়েভকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাকুর ক্ষোভ প্রশমনের অংশ হিসেবে এরদোগান ওকতাই সারাল নামের একজন সহযোগীকে বরখাস্ত করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে অবশ্য তুর্কিক ভাষাভাষী দেশগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের বিভাজনের কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। তুর্কিক বিশ্বের পারিবারিক ছক বা ঐক্যে কোনো অনৈক্যের সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি দেশগুলোকে ভাই হিসেবে অভিহিত করেন।
প্রতিবেশী আর্মেনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলাতে তুরস্কের চলমান প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে আঙ্কারা ও বাকুর এই সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজারবাইজানকে সমর্থন জানাতে ১৯৯০-এর দশকেই আর্মেনিয়ার সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল তুরস্ক, ফলে সীমান্ত খুলতে হলে বাকু ও ইয়েরেভানের সমঝোতা অপরিহার্য।
