সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গ দখল করল ইসরায়েল

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১, ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম

দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গ দখল করল ইসরায়েল

দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৯০০ বছরের প্রাচীন বিউফোর্ট দুর্গ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। স্থানীয়ভাবে কালাত আল-শাকিফ নামে পরিচিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দখলের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। ইসরায়েলি পদাতিক সেনারা লিতানি নদীর মূল সীমারেখা পেরিয়ে লেবাননের ভূখণ্ডের আরো গভীরে অগ্রসর হওয়ার পর এই কৌশলগত পরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটল।বিউফোর্ট দুর্গ এখন ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।

এই সর্বশেষ সামরিক আগ্রাসনের তীব্র সমালোচনা করেছে ইউরোপীয় পরাশক্তি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি। এর মধ্যেই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননের এক বিশাল এলাকার বেসামরিক বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা জারি করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো লেবাননের বাসিন্দাদের জাহরানি নদীর নিচের পুরো দক্ষিণ অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার সরাসরি নির্দেশ। আইডিএফের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থলসেনা এই অভিযানে অংশ নিয়েছে এবং বর্তমানে তাদের এই সামরিক তৎপরতা আরো নতুন নতুন এলাকায় সম্প্রসারিত হচ্ছে। হিজবুল্লাহর সদস্য বা সামরিক স্থাপনার কাছাকাছি থাকা যেকোনো ব্যক্তি নিজের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন বলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী হুশিয়ারি দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে যোগ দিয়ে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহকে এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি লিখেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করছে, যা কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ সংকুচিত করে তুলছে। একই সাথে তিনি হিজবুল্লাহকেও ইসরায়েলের ওপর রকেট হামলা বন্ধ এবং সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করার তাগিদ দেন। অন্যদিকে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেশের দক্ষিণে পোড়ামাটি নীতি এবং যৌথ শাস্তি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।

 লেবাননের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকা ফ্রান্স এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক ডাকার অনুরোধ জানিয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জোর দিয়ে বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননে বর্তমানে যে বড় ধরনের আগ্রাসন চলছে তার কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং সবপক্ষের অস্ত্র এখনই শান্ত হওয়া জরুরি। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল ব্যারোট এই পরিস্থিতিকে ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ভুল হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল একে গুরুতর উদ্বেগের কারণ বলে বর্ণনা করেছেন।

লিতানি উপত্যকার ওপর অবস্থিত এই বিউফোর্ট দুর্গটি প্রায় ৯০০ বছর আগে ক্রুসেডাররা নির্মাণ করেছিল। ইসরায়েল সীমান্ত থেকে মাত্র ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর আগে ৪৪ বছর আগে ১৯৮২ সালেও প্রথম লেবানন যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই দুর্গটি প্রথমবার দখল করেছিল। পরবর্তীতে ২০০০ সালে তারা যখন দক্ষিণ লেবাননের স্বঘোষিত নিরাপদ অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়, তখন এই দুর্গের নিয়ন্ত্রণও ত্যাগ করেছিল। দীর্ঘ বছর পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গোলানি ব্রিগেড আবারও এই দুর্গের ওপর নিজেদের পতাকা উত্তোলন করল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এটিকে একটি কৌশলগত বিজয়ের পাশাপাশি অত্যন্ত প্রতীকী একটি বিজয় বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেছেন, এটি তাদের নীতির একটি নিষ্পত্তিমূলক ধাপ এবং তারা সিরিয়া, গাজা ও লেবাননের সব ফ্রন্টে একযোগে অভিযান প্রসারিত করছেন।

গত ২ মার্চ ইসরায়েলি এক বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাত নতুন ও ভয়াবহ রূপ নেয়। এর পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলে ব্যাপক রকেট হামলা শুরু করে হিজবুল্লাহ। সেই হামলার জবাবেই ইসরায়েল পুরো লেবানন জুড়ে এই জোরদার বিমান ও স্থল হামলা শুরু করে। লেবানন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, তখন থেকে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও এখনো লেবাননের ভূখণ্ডে হামলা ও অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

banner
Link copied!