মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত আমদানি শুল্ক ফাঁকি দিতে চীনকে বিশ্বের চল্লিশটিরও বেশি দেশ সহায়তা করছে বলে হোয়াইট হাউসের এক নতুন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিবিসি নিউজ ও আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য ঘুরিয়ে এনে কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি সহায়তা করেছে ভারত, মেক্সিকো, কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাণিজ্য অংশীদারেরা। হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো এই কর্মকাণ্ডকে একটি বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ছায়া নেটওয়ার্ক হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি নিজেদের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান খুইয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় এই কৌশলটি মূলত ট্রান্সশিপমেন্ট বা পুনঃচালান নামে পরিচিত, যার আওতায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পাঠিয়ে নামমাত্র প্রক্রিয়াকরণ ও মোড়ক পরিবর্তনের মাধ্যমে চূড়ান্ত গন্তব্যে পাঠানো হয়। হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, বেইজিং এই পদ্ধতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন দেশে পণ্যের ভুয়া লেবেল লাগিয়ে আসল উৎপাদক দেশের পরিচয় গোপন করছে। মার্কিন প্রশাসন একে নথিপত্রের আড়ালে সংগঠিত জালিয়াতি বলে উল্লেখ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে হোয়াইট হাউস জানায়, উচ্চ শুল্কযুক্ত দেশ থেকে কম শুল্কের দেশগুলোর মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার কোটি ডলার থেকে ত্রিশ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও উৎপাদন নীতি বিষয়ক কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, এই ভুয়া পুনঃচালানের কারণে মার্কিন কোষাগার প্রতি বছর আনুমানিক এক হাজার নয় শত কোটি থেকে দুই হাজার ছয় শত কোটি মার্কিন ডলারের রাজস্ব হারাচ্ছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ শিল্পখাত চাপে পড়ায় প্রায় সাড়ে চার লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মার্কিন কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সেমিকন্ডাক্টর সার্কিট, অ্যালুমিনিয়াম পণ্য এবং মোটর যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন সীমান্ত কর্তৃপক্ষ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে, যা বাণিজ্যিক জাহাজের কার্গো তথ্য বিশ্লেষণ করে মিথ্যা ঘোষণা শনাক্ত করছে।
হোয়াইট হাউসের এই অভিযোগের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত চীনা দূতাবাস। দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাণিজ্য যুদ্ধে কখনো কারও জয় হয় না এবং বেইজিং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের একতরফা শুল্ক নীতি ও চীনা সংস্থাকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর তীব্র বিরোধিতা করে। চীনা মুখপাত্র সতর্ক করে বলেন, ট্রানজিট পণ্য সংক্রান্ত যেকোনো পদক্ষেপ যেন তৃতীয় কোনো দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না করে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার মধ্যবর্তী দেশগুলোতে উৎপাদন স্থানান্তর কি আন্তর্জাতিক শিল্প ব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিবর্তন, নাকি কেবল মার্কিন কর ফাঁকি দেওয়ার পরিকল্পিত চাতুরী।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো। সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক চ্যাং পাও লি বিবিসিকে জানান, এই তথ্যগুলো আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনের দরকষাকষির অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো যেসব দেশ চীনা সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, তারা এখন ওয়াশিংটনের কঠোর নজরদারি ও নতুন বিধিনিষেধের ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে।
