ভারতের কেরালার ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হলো রাজ্য রাজনীতি। বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পেরাম্ব্রা আসনে জয়লাভ করে ইতিহাস গড়েছেন ৩৪ বছর বয়সী তরুণ আইনজীবী ফাতিমা তাহিলিয়া। এই জয়ের মাধ্যমে তিনি ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের (আইইউএমএল) ৭৫ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী বিধায়ক (এমএলএ) হিসেবে রাজ্য আইনসভায় প্রবেশ করতে যাচ্ছেন।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) আনুষ্ঠানিক ফলাফল এবং দ্য হিন্দু`র প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহিলিয়া মোট ৮১ হাজার ৪২৯ ভোট পেয়েছেন। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী) জ্যেষ্ঠ নেতা এবং এলডিএফ আহ্বায়ক টি.পি. রামকৃষ্ণনকে ৫ হাজার ৮৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এই ফলাফল কোঝিকোড় জেলায় ক্ষমতাসীন বামফ্রন্টের জন্য একটি বড় ধাক্কা। রামকৃষ্ণন এই আসনটিতে গত তিনটি নির্বাচনে অপরাজিত ছিলেন এবং ২০২১ সালে তিনি ২২ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউডিএফ) অন্যতম প্রধান শরিক আইইউএমএল-এর জন্য এই জয় একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ঐতিহ্যগতভাবে দলটির রক্ষণশীল কাঠামোর কারণে নারীদের সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। দ্য হিন্দু জানিয়েছে, এই নির্বাচনের আগে আইইউএমএল মাত্র দু`বার নারী প্রার্থীদের সুযোগ দিয়েছিল—১৯৯৬ সালে কামারুন্নিসা আনোয়ার এবং ২০২১ সালে নুরবিনা রশিদ। কিন্তু সেবার তারা দুজনেই পরাজিত হন। এবার কোথুপারাম্ব আসনে জয়ন্তী রাজন নামে আরেকজন নারীকে দলটি মনোনয়ন দিলেও তিনি জয়লাভ করতে পারেননি।
দ্য উইক-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহিলিয়ার নির্বাচনী প্রচারণায় স্থানীয় জনকল্যাণ ও জীবিকার বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। প্রবীণ ভোটারদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের পাশাপাশি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন। এমনকি মার্চ মাসের শেষদিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও পেরাম্ব্রায় তার পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন, যা তৃণমূলের ভোটারদের মাঝে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি করেছিল।
তবে তাহিলিয়ার এই রাজনৈতিক যাত্রা খুব একটা মসৃণ ছিল না। কোঝিকোড় সিটি করপোরেশনের সাবেক এই কাউন্সিলর বর্তমানে জেলা আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ছাত্ররাজনীতি থেকেই তিনি সংস্কার এবং লিঙ্গসমতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের (এমএসএফ) নারী শাখা `হারিতা`-র প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সভাপতি হিসেবে তিনি মুসলিম নারীদের শিক্ষা, হিজাব পরিধানের অধিকার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে নিয়মিত কথা বলেছেন।
নিজের দলের ভেতরেও তাকে বিভিন্ন সময় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। ২০২১ সালে এমএসএফ-এর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার বিরুদ্ধে নারীদের প্রতি অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। সে সময় অভিযোগকারী নারীদের পাশে দাঁড়ানোয় এবং রাজ্য মহিলা কমিশনে অভিযোগ দায়েরের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাহিলিয়াকে এমএসএফের জাতীয় সহ-সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
এত বাধা এবং দলের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ সত্ত্বেও তার বর্তমান জয় প্রমাণ করে যে, সাধারণ ভোটার এবং নতুন নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেরালায় স্থানীয় সরকারগুলোতে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের কারণে মূলধারার রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নয়। আইইউএমএল-এর বর্তমান রাজ্য সভাপতি সৈয়দ সাদিকালি শিহাব থাঙ্গালের তুলনামূলক উদার দৃষ্টিভঙ্গিও এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
পেরাম্ব্রা আসনের এই ফলাফল পুরো মালাবার অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে বিরোধীদের তোলা প্রশ্নকে পেছনে ফেলে ফাতিমা তাহিলিয়ার এই জয় শুধু আইইউএমএল নয়, বরং পুরো রাজ্যের তরুণ ও মুসলিম নারীদের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
