তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘ ছয় দশকের প্রতিষ্ঠিত সমীকরণ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন চলচ্চিত্র তারকা থেকে রাজনীতিতে আসা সি জোসেফ বিজয়। সোমবার প্রকাশিত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফলে তার দল `তামিলগা ভেত্তরি কাজগাম` (টিভিকে) একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই জয়কে রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২৩৪ আসনের বিধানসভায় বিজয়ের দল ১০৭টি আসনে জয় পেয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসনের ম্যাজিক ফিগার থেকে মাত্র ১১টি আসন দূরে রয়েছেন এই সুপারস্টার।
চেন্নাইয়ের কোলাথুর আসনে ঘটেছে বড় ধরনের রাজনৈতিক অঘটন। এই আসনে খোদ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্তালিন পরাজিত হয়েছেন টিভিকে প্রার্থী ভি এস বাবুর কাছে। স্তালিনের এই পরাজয় ডিএমকে শিবিরের জন্য এক বড় ধাক্কা। উল্লেখ্য, স্তালিন ২০১১ সাল থেকে এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলেন। এবারের নির্বাচনে ডিএমকে মাত্র ৫৯টি আসনে জয় পেয়েছে, আর তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এআইএডিএমকে পেয়েছে ৪৭টি আসন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তামিলনাড়ুর শাসন ক্ষমতা এই দুটি দলের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। বিজয়ের এই উত্থানকে অনেক বিশ্লেষক ১৯৭৭ সালে এম জি রামচন্দ্রনের (এমজিআর) উত্থানের সাথে তুলনা করছেন।
বিজয় তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেছিলেন গত বছর। তবে তার এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। গত বছর তার দলের এক র্যালিতে পদপিষ্ট হয়ে বেশ কিছু মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় তাকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। এছাড়া তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র `জন নায়গন` (জননেতা) মুক্তি নিয়ে সেন্সর বোর্ডের সাথে আইনি লড়াইও তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু ভোটের ফলে দেখা যাচ্ছে, তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং নারী ভোটাররা এই চলচ্চিত্র তারকাকে দুহাত ভরে সমর্থন দিয়েছেন। ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে বিজয়ের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী।
বিজয় মূলত দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং পরিবর্তনের ডাক দিয়ে মানুষের মন জয় করেছেন। তিনি বিজেপিকে তার আদর্শিক প্রতিপক্ষ এবং ডিএমকে-কে তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তবে এখন সরকার গঠনের জন্য তাকে ছোট দল বা স্বতন্ত্র বিধায়কদের ওপর নির্ভর করতে হবে। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ৫টি এবং পিএমকে ৪টি আসন পেয়েছে। এই দলগুলো বিজয়ের সরকারকে সমর্থন দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
রাজনীতি বিশ্লেষক শিব বিশ্বনাথনের মতে, বিজয় তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এক নতুন উদ্দীপনা নিয়ে এসেছেন। তিনি এমন এক সময়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন যখন প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর প্রতি মানুষের কিছুটা ক্লান্তি তৈরি হয়েছিল। বিজয়ের এই জয় কেবল তারকা খ্যাতির কারণে নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল পর্যায়ে তার গড়ে তোলা জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ফল। ২০০৯ সাল থেকে তিনি তার ফ্যান ক্লাবগুলোকে জনকল্যাণমূলক নেটওয়ার্কে রূপান্তর করেছিলেন, যা শিক্ষা ও স্থানীয় সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, সিনেমার পর্দা থেকে রাজনীতির উত্তাল ময়দানে আসা এই নায়ক জোট গঠনের জটিল সমীকরণ সামলে কত দ্রুত সরকার গঠন করতে পারেন।
