শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মোদী কেন সোনা ও বিদেশ ভ্রমণে লাগাম টানতে বলছেন?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৫, ২০২৬, ১০:৪১ এএম

মোদী কেন সোনা ও বিদেশ ভ্রমণে লাগাম টানতে বলছেন?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীকে এক বিরল কৃচ্ছ্রসাধনের ডাক দিয়েছেন। গত ১০ মে হায়দ্রাবাদের এক জনসভায় তিনি ভারতীয়দের সোনা কেনা কমানোর এবং অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলার সরাসরি পরামর্শ দেন। এর মাত্র তিন দিন পরই ১৩ মে ভারত সরকার সোনা ও রুপা আমদানির ওপর শুল্ক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা দেয়। মোদীর এই বার্তা ও সরকারি পদক্ষেপ ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা এবং ডলারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দেওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ। দীর্ঘ দুই মাস ধরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। ভারত তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং গ্যাসের অর্ধেকই বিদেশ থেকে আমদানি করে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ভারতের আমদানি ব্যয় হু হু করে বাড়ছে। এর ফলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবের ঘাটতি (CAD) বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৬৯০ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে অবস্থান করছে, যা গত মে মাসের শুরুর দিকের তুলনায় প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার কম। রিজার্ভ কমে যাওয়ার এই গতি নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সোনা ভারতের আমদানির তালিকায় জ্বালানি তেলের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে। বিয়ের মৌসুম ও উৎসবের কারণে ভারতীয়রা বিপুল পরিমাণ সোনা কেনে, যার অর্থ হলো ডলার খরচ করে বিদেশ থেকে সোনা আনা। এই মুহূর্তে ভারত সরকারের অগ্রাধিকার হলো ডলার বাঁচানো এবং তা কেবল খাদ্য নিরাপত্তা, সার, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় করা।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মোদীর এই আহ্বানকে ১৯৯১ সালের লেনদেন ভারসাম্যের সংকটের সাথে তুলনা করছেন। যদিও তখন ভারতের হাতে মাত্র তিন সপ্তাহের আমদানির অর্থ ছিল এবং বর্তমানে প্রায় ১১ মাসের আমদানির সক্ষমতা রয়েছে, তবুও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছেন। এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পুঁজি বহির্গমন। তেলের বাড়তি দামের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দিকে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক ভারতকে এই কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এদিকে ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি আনন্ত নাগেশ্বরণ জানিয়েছেন, রুপির পতন রোধ এবং বহিঃস্থ ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে এই বছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান ইতিমধ্যে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৯৫.৬৩-তে পৌঁছেছে। মুদ্রার এই অবমূল্যায়ন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে, যা পরোক্ষভাবে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। সরকার আশা করছে, সোনা ও বিদেশ ভ্রমণে লাগাম টানলে আমদানির চাপ কিছুটা কমবে এবং ডলারের বহির্গমন নিয়ন্ত্রিত হবে।

তবে সাধারণ মানুষের জন্য এই সিদ্ধান্ত বড় ধরনের ভোগান্তি বয়ে আনছে। আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপের ফলে স্থানীয় বাজারে সোনার দাম এক ধাক্কায় ৬ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। বিমান ভাড়া কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবাসী ভারতীয় ও সাধারণ পর্যটকরা সংকটে পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ‘কোভিড-কালীন’ স্টাইল প্রচার অনেককে আতঙ্কিত করে তুলেছে। সমালোচকদের মতে, বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই পদক্ষেপগুলো প্রচার ছাড়াই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে নেওয়া উচিত ছিল। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ ভারতের অর্থনীতিতে যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে যাচ্ছে, মোদীর সাম্প্রতিক বার্তাটি তারই আগাম সতর্কবার্তা।

banner
Link copied!