শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ ছাড়া নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আধুনিক ড্রোন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৮, ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ ছাড়া নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আধুনিক ড্রোন

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চিরচেনা দৃশ্যপট এখন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে। বিগত কয়েক দশক ধরে যুদ্ধের ময়দানে যেখানে ভারী ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান এবং ফাইটার জেটগুলো প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল, সেখানে বর্তমান সময়ে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ড্রোন। বিবিসির প্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান অনুষ্ঠান টেক নাউ-এর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানব অপারেটরের দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সরাসরি সর্বশেষ প্রজন্মের ড্রোনগুলো পরিচালনা করছে। প্রযুক্তিগত এই অভাবনীয় রূপান্তর বিশ্বজুড়ে সামরিক কৌশলবিদ ও গবেষকদের চিন্তাভাবনায় এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করেছে।

প্রথাগত ভারী সামরিক সরঞ্জামগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব কমিয়ে দিয়ে ড্রোন বর্তমানে যুদ্ধের পুরো মোড় ঘুরিয়ে দিতে শুরু করেছে। অতীতে ড্রোন পরিচালনার জন্য সার্বক্ষণিক মানব অপারেটরের উপস্থিতি ও রিমোট সংযোগের আবশ্যকতা থাকলেও, আধুনিক প্রযুক্তি সেই পরিধিকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে এখন এই আকাশযানগুলো জটিল এবং পরিবর্তনশীল যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও রিয়েল-টাইম ডাটা প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করতে সক্ষম। লক্ষ্যবস্তু নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা থেকে শুরু করে সুনির্দিষ্ট আক্রমণ পরিচালনার প্রতিটি পদক্ষেপে তারা মানুষের ওপর নির্ভরতা প্রায় পুরোপুরি কমিয়ে এনেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংঘাতের ময়দানে ড্রোনের এমন ব্যাপক ও সফল ব্যবহার বিশ্ববাসীকে নতুন এক বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বৃহৎ সামরিক শক্তিগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা খাতগুলোও এখন মানবহীন আকাশযানের গবেষণা ও উৎপাদনে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি নিউজ এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রচলিত স্থলভাগের ভারী অস্ত্রশস্ত্রের তুলনায় অনেক কম খরচে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শত্রুর প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পারার ক্ষমতার কারণে ড্রোনের কদর দিন দিন বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে সামরিক ক্ষেত্রে এই উচ্চ প্রযুক্তির সংযোজন আধুনিক যুদ্ধের নৈতিকতা ও আইনি জবাবদিহিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত অ্যালগরিদম চালিত হওয়ায় এই ড্রোনগুলো এখন চরম প্রতিকূল ও শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশেও স্বাধীনভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের পালটা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা জ্যামিং প্রযুক্তির কারণে যোগাযোগের সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হলেও এই ড্রোনগুলো নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে মিশন সফল করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে নিজ দেশের সেনার প্রাণহানি কমানোর জোরালো যুক্তি দেখিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্পগুলো এই প্রযুক্তির উন্নয়নে বিপুল উৎসাহ দেখাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি নিয়ে তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বিশ্বের শীর্ষ সামরিক ও প্রযুক্তি পরাশক্তিগুলো বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অস্ত্র ব্যবস্থার এক তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব নিরাপত্তার সামগ্রিক কাঠামোর ওপর নতুন ধরনের বহুমুখী চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অস্ত্রের এই আধুনিক প্রতিযোগিতার লাগাম টেনে ধরতে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বজায় রাখতে কার্যকর বৈশ্বিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে অনুভব করছেন নীতি নির্ধারকরা। আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতি ও যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি কোন নির্দিষ্ট দিকে মোড় নেবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এই সামরিক ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিয়মের সফল বাস্তবায়নের ওপর।

প্রতিরক্ষা খাতের গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অবাধ প্রবেশাধিকার মানব নিয়ন্ত্রণের সীমাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেয় বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, তবে তার দায়ভার কার ওপর বর্তাবে তা নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি হয়নি। ফলস্বরূপ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও নৈতিক সুরক্ষার এই দ্বন্দ্বে বিশ্বসমাজ এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড়ে এসে উপনীত হয়েছে।

banner
Link copied!