তীব্র দাবদাহে জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে এয়ার কন্ডিশনার বা এসির ওপর নির্ভরশীলতা এখন প্রায় সব ঘরেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে। কিন্তু গরম থেকে মুক্তি দেওয়া এই স্বস্তির যন্ত্রটিই কখনো কখনো চরম প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং সচেতনতার অভাবে এসি থেকে অগ্নিকাণ্ড বা ভয়াবহ বিস্ফোরণের মতো ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। প্রযুক্তি ও অগ্নিনির্বাপণ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচণ্ড গরমে যন্ত্রটি একটানা চলতে থাকলে এবং এর ভেতরে সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি থাকলে তা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। দৈনন্দিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু নিয়ম এবং সতর্কতা মেনে চললেই এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব।
সাধারণত দীর্ঘসময় ধরে একটানা ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণেই এসিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। দ্য ডেইলি স্টারের মতো সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রীষ্মের সময় এসি বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের হার অন্যান্য সময়ের তুলনায় উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যায়। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এসির ভেতরে জমে থাকা ধুলোবালি ও ময়লা। দীর্ঘদিন এসি পরিষ্কার না করলে এর ভেতরের এয়ার ফিল্টার পুরোপুরি জ্যাম হয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিক বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং ঘরকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঠান্ডা করতে কম্প্রেসারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এই বাড়তি চাপ একপর্যায়ে যন্ত্রটিকে অতিরিক্ত উত্তপ্ত করে তোলে, যা বিস্ফোরণের বা আগুন লাগার প্রাথমিক ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, প্রতি দুই থেকে চার সপ্তাহ অন্তর ব্যবহারকারীকে নিজেই এসির এয়ার ফিল্টার খুলে পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
এসির জন্য বৈদ্যুতিক সংযোগের ত্রুটি আরেকটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে কাজ করে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বিভিন্ন সতর্কবার্তায় নিয়মিত বলা হয় যে, এসির মতো ভারী যন্ত্রের জন্য সবসময় সঠিক মাপের বা উপযুক্ত গেজের তার ব্যবহার করতে হবে। বাড়িতে থাকা সাধারণ তার দিয়ে এসি চালালে তা দ্রুত গলে যেতে পারে। ঢিলা বা ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং নিম্নমানের তার থেকে যেকোনো সময় শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন লাগতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ভোল্টেজ ওঠানামা করার তীব্র সমস্যা রয়েছে, সেখানে এই ঝুঁকি আরো অনেক বেশি। বিদ্যুতের এই অস্থিতিশীলতা সরাসরি এসির মূল অংশ অর্থাৎ কম্প্রেসারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই সমস্যা এড়াতে এসির সাথে একটি ভালো মানের ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত বৈদ্যুতিক তার, প্লাগ, সুইচ ও সার্কিট ব্রেকার পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
ঘরের ভেতরের ইউনিটের পাশাপাশি এসির বাইরের অংশ বা আউটডোর ইউনিটের দিকেও সমান নজর দেওয়া প্রয়োজন। শহরের অনেক বাড়িতেই আউটডোর ইউনিট এমন সংকীর্ণ বা আবদ্ধ জায়গায় স্থাপন করা হয় যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকে না। সেখানে ধুলো বা পাখির বাসা তৈরি হয়ে আবর্জনা জমে গেলে যন্ত্রের ভেতরের তাপ ঠিকমতো বের হতে পারে না। তাপ ভেতরে আটকে থাকলে খুব দ্রুত কম্প্রেসার গরম হয়ে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এ ছাড়া এসির রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস লিক হওয়া একটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর ঘাতক। কনজ্যুমার রিপোর্টস-এর তথ্য অনুযায়ী, বাজারে অনেক সময় সস্তা ও নকল রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস বিক্রি হয় যা অত্যন্ত দাহ্য। কখনো যদি ঘরে অস্বাভাবিক রাসায়নিক গন্ধ পাওয়া যায় বা মনে হয় এসির ঠান্ডা করার ক্ষমতা হঠাৎ কমে গেছে, তবে সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রটি বন্ধ করে দক্ষ টেকনিশিয়ান ডাকা উচিত।
যেকোনো বড় ধরনের যান্ত্রিক দুর্ঘটনা এড়াতে পেশাদার টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে বছরে অন্তত দুই থেকে তিনবার এসির সম্পূর্ণ সার্ভিসিং করানো উচিত। প্রচণ্ড গরমেও এসি একটানা কয়েক ঘণ্টা চালানোর পর সেটি কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা ভালো। মাঝেমধ্যে যন্ত্রটিকে বন্ধ রেখে বিশ্রাম দিলে এর আয়ু বাড়ে এবং অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়া যন্ত্রাংশগুলো স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসার সুযোগ পায়। মেরামতের সময় কয়েক টাকা বাঁচানোর জন্য নিম্নমানের বা নকল যন্ত্রাংশের পরিবর্তে সর্বদা বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের এবং অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারের আসল পার্টস ব্যবহার করা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। একটু সচেতনতা, সঠিক ভোল্টেজ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত যত্ন নেওয়ার মাধ্যমেই একটি পরিবারকে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
