বিশ্বখ্যাত রন্ধনশিল্পী, সফল উদ্যোক্তা এবং জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক পদ্মা লক্ষ্মীর কাছে ভ্রমণ কেবল কোনো শখের বিষয় নয়, বরং এটি তার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। গত ১৯টি সিজন ধরে ‘টপ শেফ’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা এবং ‘টেস্ট দ্য নেশন উইথ পদ্মা লক্ষ্মী’র মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে খাদ্যের বৈচিত্র্য খুঁজে বের করেছেন। সম্প্রতি বিবিসি নিউজের এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তার দীর্ঘ ভ্রমণ জীবনের অভিজ্ঞতা এবং যান্ত্রিক জীবন থেকে সুস্থ থাকার কৌশলগুলো শেয়ার করেছেন। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে একজন পেশাদার পরিব্রাজক বছরের প্রায় আট মাস রাস্তায় কাটিয়েও নিজের শরীর ও মনের ভারসাম্য বজায় রাখেন। পদ্মা লক্ষ্মী জানান যে তার নতুন রন্ধন প্রতিযোগিতা সিরিজ ‘আমেরিকা’স কালিনারি কাপ’ গত ৪ মার্চ প্রিমিয়ার হয়েছে যেখানে মিশেলিন স্টারপ্রাপ্ত শেফরা বড় পুরস্কারের জন্য লড়াই করছেন।
ভ্রমণকালীন জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে পদ্মা লক্ষ্মীর প্রধান অস্ত্র হলো সুগন্ধি বা ধূপ। তিনি সবসময় তার সুটকেসে কিছু ধূপকাঠি রাখেন যা তার সুটকেসের ভেতরের কাপড়গুলোকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। হোটেল রুমে পৌঁছে তিনি এই ধূপ জ্বালান যা তাকে মেডিটেশন বা প্রার্থনায় মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে এবং অপরিচিত পরিবেশেও বাড়ির মতো একটি পরিচিত ঘ্রাণ তৈরি করে। তার মতে সুঘ্রাণ মানুষের স্নায়ুকে শান্ত রাখতে দারুণ কার্যকর। ব্যাগ গুছানোর ক্ষেত্রেও তিনি বেশ কৌশলী। তিনি সবসময় সুটকেসের নিচে কয়েকটি সারং বা পাতলা চাদর রাখেন যা হোটেলের সোফা বা বিছানায় ব্যবহার করেন যাতে সরাসরি আসবাবের সংস্পর্শে না আসতে হয়। এছাড়া পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি কেবল দুই থেকে তিনটি রঙের পোশাক বেছে নেন যাতে সেগুলো সহজেই একটির সাথে আরেকটি মিলিয়ে পরা যায়।
পদ্মা লক্ষ্মীর কাছে বিমানে যাতায়াত করা মানেই হলো কড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। তিনি জানিয়েছেন যে বিমানে থাকাকালীন তিনি কখনোই মদ্যপান করেন না কারণ অ্যালকোহল শরীরকে পানিশূন্য করে ফেলে এবং মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবর্তে তিনি প্রতি ৪৫ মিনিট অন্তর অন্তত ১৬ আউন্স পানি পান করার চেষ্টা করেন। দীর্ঘ ফ্লাইটে ত্বকের যত্ন নিতে তিনি মুখে কোনো মেকআপ করেন না এবং বিমানে ওঠার আগেই প্রচুর পরিমাণে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করেন। বিমানে থাকাকালীন ইলেকট্রোলাইট এবং ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ পানীয় তার নিত্যসঙ্গী যাতে শরীর দুর্বল না হয়ে পড়ে। বিমানে ঘুমানোর জন্য তিনি এক অদ্ভুত পদ্ধতি অবলম্বন করেন যাকে তিনি নিজেই ‘সারকোফ্যাগাস’ বা কফিনের মতো ঢেকে রাখা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি একটি বড় শাল দিয়ে মাথা ও মুখ ঢেকে ঘুমান যাতে বাইরের আলো বা মানুষের উপস্থিতি তাকে বিরক্ত না করে।
খাবারের সন্ধানে পদ্মা লক্ষ্মী সবসময় নতুনত্বের খোঁজে থাকেন। কোনো নতুন শহরে গেলে তিনি প্রথমেই সেখানকার লোকাল মার্কেট বা কাঁচাবাজারের খোঁজ করেন। ফাইভ স্টার হোটেলের খাবারের চেয়ে রাস্তার ধারের স্ট্রিট ফুড তার বেশি পছন্দ। তিনি অদ্ভুত এক কৌশলে ভালো খাবারের সন্ধান পান আর তা হলো ক্যাব চালকদের কাছে জানতে চাওয়া। তার মতে ক্যাব চালকরাই জানেন শহরের কোন কোণে সবচেয়ে সুস্বাদু এবং ঘরোয়া খাবার পাওয়া যায়। সম্প্রতি মিনিয়াপলিসে একটি অ্যাডভোকেসি ইভেন্টে গিয়ে তিনি ‘গাই নই’ নামের একটি লাওতিয়ান রেস্টুরেন্ট আবিষ্কার করেন যেখানে সুস্বাদু নুডলস ও ককটেল পাওয়া যায়। এছাড়া ভুটানের স্থানীয় বাজারে মাশরুম এবং শুকনা মরিচের স্বাদ এখনো তার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে যা তিনি বাড়িতেও নিয়ে এসেছিলেন।
পদ্মা লক্ষ্মী মনে করেন যে কেবল ভ্রমণের কৌশল জানলেই হয় না বরং পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তিই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি। দীর্ঘ সময় বিমানে থাকার ক্লান্তি দূর করতে তিনি প্রচুর পানি পানের পাশাপাশি ঘুমের ওপর জোর দেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে ত্বক ভালো রাখতে বা মেজাজ শান্ত রাখতে ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। একজন অভিজ্ঞ পর্যটক হিসেবে তার এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই তাকে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে কাজ করার শক্তি জুগিয়েছে। যারা প্রতিনিয়ত কাজের প্রয়োজনে বা শখের বশে ভ্রমণ করেন তাদের জন্য পদ্মা লক্ষ্মীর এই টিপসগুলো হতে পারে এক আদর্শ নির্দেশিকা। তার মতে ভ্রমণ কেবল জায়গা দেখা নয় বরং নতুন সংস্কৃতি এবং মানুষের সাথে মিশে নিজের দিগন্তকে প্রসারিত করা।
