কলম্বিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রিন্স হ্যারি এবং মেগান মার্কেলের সফরের পর দেশটির গ্ল্যামার এবং আকর্ষণ আন্তর্জাতিক মহলে ভিন্ন মাত্রা পায়। সে বছর প্রায় ৬৬ লাখ পর্যটক দেশটিতে ভ্রমণ করেন, যা দেশটির ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। তবে এই চোখ ধাঁধানো সাফল্যের আড়ালে কলম্বিয়ার দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই হামলার জন্য সরাসরি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন।
গত এপ্রিলের শেষে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কাউকা অঞ্চলে প্যান-আমেরিকান হাইওয়েতে এক ভয়াবহ বোমা হামলায় ২১ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার পর কলম্বিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় গভর্নর অক্টাভিও গুজমান এই আক্রমণকে কয়েক দশকের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সবচেয়ে নৃশংস হামলা বলে বর্ণনা করেছেন। বিদ্রোহী গোষ্ঠী ফার্কের (FARC) ভিন্নমতাবলম্বী একটি অংশ এই হামলার পেছনে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির অনেক এলাকায় গত তিন দিনে অন্তত ২৬টি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।
নিরাপত্তা সংকটের কারণে কলম্বিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় টাইরোনা ন্যাশনাল পার্ক গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ১৭ দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে পার্কের কর্মীদের ওপর প্রাণনাশের হুমকি আসায় সরকার এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। সিয়েরা নেভাদা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুটি অপরাধী সংগঠনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে ‘গাল্ফ ক্ল্যান’ নামক একটি সংগঠনকে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে কলম্বিয়ায় বর্তমানে অন্তত ৩০টি ভিন্নমতাবলম্বী সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ফরেন অফিস (FCDO) এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট কলম্বিয়া ভ্রমণের বিষয়ে নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চল, ভেনিজুয়েলা এবং ইকুয়েডর সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোকে ‘অত্যাবশ্যকীয় কাজ ছাড়া ভ্রমণ না করার’ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের জন্য বিখ্যাত সান অগাস্টিন প্রত্নতাত্ত্বিক পার্কের মতো জায়গাগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও বিশেষ নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, কলম্বিয়া কি আবার তার সেই পুরনো মাদক সম্রাট পাবলো এসকোবারের অন্ধকার যুগে ফিরে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নটি এখন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
অবশ্য কলম্বিয়া সরকার এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি ম্যাগডালেনা নদীতে বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ চালুর মাধ্যমে পর্যটনকে নতুন রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আমা ওয়াটারওয়েজ’ এই নদীতে তাদের দ্বিতীয় জাহাজটি নামিয়েছে, যা মূলত পাখি প্রেমী পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য। পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, কলম্বিয়ার মানুষ অত্যন্ত সহনশীল এবং অতিথিপরায়ণ, যা দেশটির পর্যটনকে টিকিয়ে রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক বোমা হামলা সেই আস্থায় ফাটল ধরাতে পারে।
আগামী ৩১ মে কলম্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে নির্বাচনের আগে কলম্বিয়ার পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। ভ্রমণ ঝুঁকির গোয়েন্দা তথ্য প্রদানকারী সংস্থা টিআরআইপি (TRIP) গ্রুপের মতে, নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এই মুহূর্তে যারা কলম্বিয়া ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য কড়া নিরাপত্তা সতর্কতা মেনে চলা এবং সংগঠিত ট্যুর অপারেটরদের সহায়তা নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। স্বপ্নের গন্তব্য কলম্বিয়া কি শান্তির পথে থাকবে নাকি সংঘাতের আঁধারে তলিয়ে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে।
