ইয়েমেন যুদ্ধ গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর পুনরায় মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। আল জাজিরা ও এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নতুন করে আক্রমণ শুরু করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুই হাজার বাইশ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বর্তমান সংঘাতই সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনা হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যারা আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত এবং দেশের রাজধানী সানাসহ উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। নব্বইয়ের দশকে আত্মপ্রকাশকারী এই গোষ্ঠীটি চৌদ্দ সালে তৎকালীন সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে এবং পরবর্তীতে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। ইরান সমর্থিত প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হিসেবে বিবেচিত হলেও হুতিরা নিজেদের স্বাধীন ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করে আসছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও আঞ্চলিক অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের উপস্থিতি জোরালো করেছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের সংকটে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে সৌদি আরব, যারা পনেরো সালের মার্চ মাসে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল। পরবর্তীতে তেহরানের সাথে রিয়াদের কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে রিয়াদ এখনও অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে প্রতিনিধিত্ব করছে প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল, যা দুই হাজার বাইশ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদ-রাব্বু মনসুর হাদীর ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে গঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি রাশাদ আল-আলিমির নেতৃত্বে গঠিত এই কাউন্সিলে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি একত্রিত হয়ে হুতিবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
এছাড়া সংঘর্ষে সক্রিয় রয়েছে সুন্নি ইসলামপন্থী দল আল-ইসলাহ এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি আলী আব্দুল্লাহ সালেহের ভাতিজা তারেক সালেহের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস। মারিব অঞ্চলের গ্যাস ও তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে আল-ইসলাহ দলটির সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রেখেছে, অন্যদিকে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস একটি ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেন গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন পক্ষের এই বহুমুখী অবস্থান ও চলমান সামরিক উত্তেজনার ফলে ইয়েমেনের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
