মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক সংঘাত তীব্র রূপ নেওয়ায় বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে বলে বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম জুলাইয়ের পর এই প্রথম ১০০ ডলারে পৌঁছাল, যদিও পরবর্তীতে তা সামান্য কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৯০ ডলারে নেমে আসে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই সামরিক সংঘাতের ফলে জ্বালানি বাজার পুনরায় গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
তেহরান একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিমান হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সাথে যুক্ত চারটি ট্যাংকার এবং খার্গ দ্বীপের কাছে আরও একটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়। হামলার পর ওমান উপসাগরে এমটি রিয়েসকো নামের একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার সম্পূর্ণ ডুবে যায়। পেন্টাগন দাবি করেছে, লক্ষ্যবস্তু করা এই জাহাজগুলো একটি বহু কোটি ডলারের গোপন নেটওয়ার্কের অংশ ছিল, যা গার্ড কোর ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নে ব্যবহৃত হতো।
খার্গ দ্বীপে অবস্থিত ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনালের মধ্য দিয়ে দেশটির মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
মার্কিন এই অভিযানের জবাবে তেহরানও সরাসরি সামরিক পাল্টা জবাব দিয়েছে। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশটির ভূখণ্ডে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার মধ্যে ১৮টি আকাশে ধ্বংস করা হয় এবং বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুসারে রেভল্যুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের সময় দুটি মার্কিন জাহাজ, আটটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং বিধিনিষেধ অমান্যকারী আরও ১০টি জাহাজে আক্রমণ চালিয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম তীব্র ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার। কিন্তু বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনকারী কৌশলগত হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে পেট্রোলের দাম নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাইয়ের শেষভাগে দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই উপসাগরীয় জলসীমায় এই অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে বলে উম্মাহকণ্ঠ ডট কম পর্যবেক্ষণ করেছে।
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালী থেকে চালকহীন একটি মার্কিন সাবমেরিন জব্দের দাবি করে ইরানি নৌবাহিনী। তবে সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন বাহিনীর পরিচালিত নজরদারি ড্রোনটি মূলত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অচল হয়ে পড়েছিল। তিনি স্পষ্ট করেন, পুরোনো মডেলের এই যন্ত্রটিতে কোনো সংবেদনশীল রাডার সরঞ্জাম ছিল না এবং আঞ্চলিক জলসীমায় মার্কিন অভিযান স্বাভাবিক গতিতেই অব্যাহত রয়েছে।
আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটিয়ে মঙ্গলবার সৌদি আরবের জ্বালানি ও বেসামরিক স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা, যেখানে ৭৩ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সাথে কলম্বিয়া সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মন্তব্য করেছেন, ইরান মার্কিন জাহাজে হামলার চেষ্টা চালালেই তাদের তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হবে।
