পশ্চিম তীরে অধিকৃত হেবরন শহরের উত্তরে অবস্থিত বেইত উম্মার এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও সামরিক আগ্রাসন উপেক্ষা করে নিজেদের ফসলি জমি রক্ষায় দিনরাত পাহারা দিচ্ছেন ফিলিস্তিনি কৃষকরা, আল জাজিরা জানিয়েছে। পাহাড়বেষ্টিত এই অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারীরা নতুন নতুন চৌকি গড়ে তোলায় ফিলিস্তিনিদের কৃষিভূমিতে যাতায়াতের পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ছাপ্পান্ন বছর বয়সী কৃষক থিবা আল-সাবা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার অবশিষ্ট আঙ্গুর বাগান পাহারা দেন, যা একসময় তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ছিল। তিনি জানান, জমি তাকে অধিকার আঁকড়ে থাকার শিক্ষা দিয়েছে এবং পরিবারের বহু বছরের ঘাম ও পরিশ্রমের ফসল তিনি কখনো হাতছাড়া হতে দেবেন না।
ফসলি জমি ধ্বংস করতে গবাদিপশুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বসতি স্থাপনকারীরা।
থিবা জানান, জমি চাষাবাদ ও পরিচর্যার পর বসতি স্থাপনকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের ভেড়ার পাল জমিতে ঢুকিয়ে দেয়, ফলে ফসল মাড়িয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, জমিতে কারো আনাগোনা টের পেলেই তারা সশস্ত্র হামলা চালায়। একই পরিস্থিতির শিকার পাশের জমির উনষাট বছর বয়সী কৃষক আনোয়ার সাবারনেহ ও তার পরিবারের সদস্যরা। ধারাবাহিক হামলার মুখে তার দুই ভাই পৈতৃক কৃষিজমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আনোয়ার জানান, বাড়ি থেকে মাত্র তিনশ মিটার দূরে অবস্থিত নিজের আঙ্গুর বাগানে পৌঁছানোও এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিজেদের জমিতে কাজ করার জন্যও ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক অনুমতির বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। আনোয়ার জানান, বসতি স্থাপনকারীদের সাথে সামরিক সেনারা এসে তার নিজের বাড়ির উঠানে ও বাগানে কাজ করার জন্য অনুমতিপত্র দাবি করে। এমনকি আট মাসের বেশি সময় ধরে তিনি নিজের ভেড়ার পাল খোয়াড়ে আটকে রাখতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ বাইরে বের করলেই সেগুলো ছিনিয়ে নিয়ে যায় বসতি স্থাপনকারীরা। অপহৃত গবাদিপশু ফেরত আনার চেষ্টা করলে স্থানীয় তরুণেরা সামরিক বাহিনীর হাতে মারধর ও আটকের শিকার হচ্ছেন।
ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি ও প্রাচীর প্রতিরোধ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই পশ্চিম তীরে সামরিক বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা মিলে মোট ১১ হাজার ৭৪টি আক্রমণ চালিয়েছে, যার মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার সরাসরি বসতি স্থাপনকারীদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে। কমিশনের পরিচালক ও গবেষক হাসান ব্রেইজিয়েহ জানান, প্রবেশপথে সামরিক ফটক নির্মাণ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকারী সড়ক অবকাঠামোর কারণে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের চাষাবাদি জমিতে পৌঁছাতে পারছেন না। ফলস্বরূপ কৃষকরা টানা চতুর্থ মৌসুমের মতো জলপাই, আঙ্গুর কিংবা পেয়ারা তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং অনেক জমি পুরোপুরি পরিচর্যাহীন অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে।
পুরুষ সদস্যরা নিহত বা আটক হওয়ার পর পরিবারের কৃষিকাজের ঐতিহ্য ও জমি ধরে রাখতে থিবা আল-সাবার মতো নারীরাই এখন মাঠের প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। হাসান ব্রেইজিয়েহ উল্লেখ করেন, এই জমি ঐতিহাসিকভাবে তাদের জীবিকার ভিত্তি এবং কোনো ত্যাগ স্বীকারের বিনিময়েই ফিলিস্তিনিরা স্বেচ্ছায় তাদের ভিটেমাটি ত্যাগ করবেন না।
