বহুমেরুকেন্দ্রীক বিশ্বে মধ্যম শক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং বহুমুখী সুযোগের নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বা এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে, আল জাজিরা এবং দ্য ওয়্যার জানিয়েছে। সম্মেলনে অংশ নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তার দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি কূটনৈতিক সংহতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। সংস্থাটির বিশকেক ঘোষণায় ইরানের ওপর সামরিক হামলার নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এই বলিষ্ঠ রাজনৈতিক সহমর্মিতা কোনো বাস্তব যৌথ সামরিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি বয়ে আনেনি।
রাজনৈতিক সমর্থন এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষার এই ব্যবধান সমকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির মোড় পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিকেরা ধারণা করছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা কাঠামোর বিপরীতে চীন ও রাশিয়ার বলয়ে হয়তো ব্রিকস কিংবা এসসিও-র মতো বিকল্প নিরাপত্তা জোট গড়ে উঠবে। মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য পশ্চিমা আধিপত্য ও নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিবেচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতগুলো পরিষ্কার করে দিয়েছে যে অনানুষ্ঠানিক এসব বহুমুখী প্ল্যাটফর্ম কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের সমকক্ষ প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
উদীয়মান এই বাস্তবতার অর্থ এই নয় যে বহুমেরুকেন্দ্রীকতা মধ্যম ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলোর জন্য ব্যর্থ হয়েছে। বরং বিশ্বব্যবস্থা প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিচ্ছে। একটি সামরিক ব্লকের বদলে আরেকটি ব্লকের জন্ম না হয়ে এখানে তৈরি হচ্ছে বহুমুখী অংশীদারিত্বের এক বিস্তৃত জাল, যেখানে রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা বাড়াতে পারলেও নিশ্চিত নিরাপত্তা পায় না।
ন্যাটোর দীর্ঘদিনের সদস্য তুরস্ক এই ভারসাম্যমূলক কূটনীতির অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ তৈরি করেছে। দেশটি পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে অবস্থান করেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য পরিহার করার কৌশল দেখিয়েছে। আঙ্কারা ন্যাটোর নিরাপত্তা সুবিধা পুরোপুরি ত্যাগ না করে মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাড়িয়েছে এবং এসসিও-তে সংলাপ অংশীদার হিসেবে যুক্ত থেকেছে। তুরস্কের এই কৌশল দ্বৈত মেরুকরণের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে নিজের কৌশলগত মর্যাদা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ব্রাজিলও একই নীতিতে বৈশ্বিক পরিসরে নিজের স্থান নির্ধারণ করছে। ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক জোটগুলোতে অন্ধভাবে শামিল না হয়ে ব্রিকস এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করেছে ব্রাসিলিয়া। কোনো একটি একক পরাশক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরতা পরিহার করে উভয় বলয়ের সঙ্গেই দরকষাকষির সক্ষমতা ধরে রাখাই বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতও তার পররাষ্ট্রনীতিতে এই ভারসাম্যকে প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করেছে। নয়াদিল্লি একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চারদেশীয় নিরাপত্তা জোট কোয়াডে অংশ নিচ্ছে, অন্যদিকে সমান সক্রিয়তায় ব্রিকস এবং এসসিও প্ল্যাটফর্মে শামিল রয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও এখন ঐতিহ্যগত মার্কিন সামরিক ছাতার নিচে থেকেও এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছে। মধ্যম শক্তিগুলোর কাছে কোনো একটি নির্দিষ্ট বলয়ে আবদ্ধ না হয়ে একাধিক ফোরাম থেকে সুবিধা নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
তবে বৃহত্তর এই কূটনৈতিক স্বাধীনতার সমান্তরালে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। ব্রিকস বা এসসিও কোনোটিই সামরিক জোট নয় এবং এগুলোর কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। ফলে মধ্যম শক্তির দেশগুলো যখন অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারেরা পাশে এসে দাঁড়ানোর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা অনুভব করে না। বিশকেক সম্মেলনে অনুমোদিত যৌথ ঘোষণা এই ইঙ্গিতই নিশ্চিত করেছে যে মধ্যম শক্তিগুলোকে তাদের জাতীয় সুরক্ষার প্রাথমিক বোঝা নিজেদের কাঁধেই বহন করতে হবে।
