যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার সেমিকন্ডাক্টর ও সোলার প্যানেল তৈরির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল পলিসিলিকন আমদানির ওপর পনেরো শতাংশ শুল্ক আরোপের একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন বলে বিবিসি নিউজ ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। বিশ্ব অর্থনীতির দুই পরাশক্তির মধ্যকার চলমান বাণিজ্যিক উত্তেজনার মধ্যেই হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই কঠোর বাণিজ্য পদক্ষেপটি নেওয়া হলো। এই আদেশের মূল লক্ষ্য হলো মার্কিন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাতকে সুরক্ষিত করা এবং বৈদেশিক প্রতিযোগিতার চাপ কমানো।
নতুন এই আদেশের অধীনে পলিসিলিকন এবং এর থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্যের ওপর নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন আমদানিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের দীর্ঘ এক জাতীয় নিরাপত্তা অনুসন্ধানের পর এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দেশটির প্রশাসন মনে করে, বিদেশি সস্তা পণ্যের আমদানির কারণে গত দুই দশকে মার্কিন পলিসিলিকন উৎপাদনের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই হাজার পাঁচ সালে বিশ্ব উৎপাদনে মার্কিন অংশীদারিত্ব যেখানে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে ছিল, তা বর্তমান সময়ে এসে অত্যন্ত নিচে নেমে গেছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন বাজারে অভ্যন্তরীণ উৎপাদক যেমন হেমলক সেমিকন্ডাক্টর এবং ওয়াকার কেমি সরাসরি উপকৃত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চীনের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই বাণিজ্য নীতি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে বলে দাবি করেছে বেইজিং। চীনা দূতাবাসের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দমনের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং বেইজিং তাদের স্ব স্ব কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে সেমিকন্ডাক্টরের ভূমিকা অপরিসীম। চিপ তৈরির এই প্রতিযোগিতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নতুন মোড় নিয়েছে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলা শুল্ক যুদ্ধ স্থগিত থাকলেও সাম্প্রতিক এই ঘোষণার মাধ্যমে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ খর্ব করতেই ওয়াশিংটন একের পর এক এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চলেছে।
আসন্ন আগামী ডিসেম্বর মাস থেকে এই নতুন শুল্ক ও সর্বনিম্ন আমদানিমূল্য সংক্রান্ত নীতিমালা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি মার্কিন সরকার দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পরিকাঠামো উন্নত করতে এগিয়ে আসবে, তারা নির্দিষ্ট পরিমাণে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা লাভ করবে।
তবে এই বাণিজ্য নীতির দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে নানাবিধ মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যখন দেশীয় শিল্প সুরক্ষার বিষয়টি সামনে আসছে, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সৌরবিদ্যুৎ এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় এই মৌলিক উপাদানের দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
অতীতের বিভিন্ন সময়েও মার্কিন প্রশাসন দেশীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান রক্ষার অজুহাতে বিভিন্ন পণ্যের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করেছে। বর্তমান প্রশাসনের এই নীতি কেবল পলিসিলিকন বা সেমিকন্ডাক্টরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ড্রোন, রোবট এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তির পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে চীনও এর পাল্টা হিসেবে ড্রোন রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রিন্টার ও কপিয়ারের মতো আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির ওপর জাতীয় নিরাপত্তা পর্যালোচনা শুরু করেছে। এই পারস্পরিক বাণিজ্য লড়াই শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
