ইরানে গাড়ির আকাশচুম্বী দাম সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার তীব্র সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। রাজধানী তেহরানের ৩২ বছর বয়সী বিপণন বিশেষজ্ঞ হোসেইন তার তেরো বছরের পুরনো স্থানীয় গাড়িটি বদলে একটি নতুন মডেল কেনার কথা ভাবলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। সাম্প্রতিক বেতন বৃদ্ধির সুবাদে তিনি ন্যূনতম মজুরির সাড়ে চার গুণ অর্থাৎ প্রায় ৯০ কোটি রিয়াল বা তিনশ নব্বই মার্কিন ডলার আয় করলেও বিদেশি আমদানি করা গাড়ি তো বটেই, স্থানীয়ভাবে তৈরি গাড়িও তার ক্রয়ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গাড়ির দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার সামরিক সংঘাতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরানে যে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে, তা দেশটির অটোমোবাইল বাজারকে স্থবির করে দিয়েছে। নিরাপত্তা কারণে নিজের পূর্ণ নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানানো হোসেইন জানান যে দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক না হলে একটি নতুন স্থানীয় গাড়ি কেনার কোনো আশাই তিনি দেখছেন না। তার বর্তমান পুরনো ফরাসি নকশার পেগিও ২০৬ গাড়িটি বিক্রি করলে একশ কোটি রিয়াল পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় গিয়ারবক্সের একটু উন্নত পেগিও ২০৭ কিনতে গেলে তাকে তার পুরো বেতনের কুড়িরও বেশি মাসের সমপরিমাণ অর্থ খরচ করতে হবে।
গাড়ি বদলানোর খরচ সাধারণ মানুষের উপার্জনের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
স্থানীয় সেডান শাহিন মডেলের দাম ৩১০০ কোটি রিয়াল ছাড়িয়ে গেছে এবং রিয়েরা ক্রসওভার মডেলটির মূল্য ৪৩০০ কোটি রিয়ালেরও বেশি। এই গাড়িগুলো কিনতে চাইলে তাকে যথাক্রমে তার পুরো বেতনের ২৪ থেকে ৩৭ মাস পর্যন্ত এক টাকাও খরচ না করে সম্পূর্ণ জমাতে হবে। কিন্তু ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আয়ের হার সেই তুলনায় স্থবির হয়ে রয়েছে, তাতে কোনো ধরনের সঞ্চয় করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন গাড়ি কেনা তো দূরের কথা, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অটোমোবাইল খাতের এই দুরবস্থার জন্য দীর্ঘকাল ধরে নানা অনিয়মকে দায়ী করা হচ্ছে।
ইরানের কিছু সরকারি কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে দেশটির এই গাড়ি বাজারকে একটি সুসংগঠিত `মাফিয়া` ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। তাদের মতে, এই খাতের সিন্ডিকেটগুলো উৎপাদনের উচ্চ ব্যয় ও অদক্ষতার সমস্ত আর্থিক চাপ সাধারণ গ্রাহক ও পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য একটি সাধারণ ব্যক্তিগত বাহন কেনাও এখন অলীক কল্পনায় পরিণত হয়েছে।
