সার্বিয়া এবং ইউক্রেন দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অভ্যর্থনা জানান দেশটির প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ। দুই নেতার মধ্যকার এই বৈঠকে দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে থাকা একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চলতি বছরের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে উভয়পক্ষ। দুই দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরের শেষ দিনে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে, যা দুই দেশের সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দুই নেতার এই বৈঠকটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের সঙ্গে বলকান অঞ্চলের একটি দেশের এমন চুক্তি কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সার্বীয় প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ জানান যে তার দেশ ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন বজায় রাখবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে। তবে রাশিয়া দীর্ঘদিনের মিত্র হওয়ায় বেলগ্রেড মস্কোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত রয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনও কসোভোর স্বাধীনতার ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়নি। সার্বিয়া কসোভোকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। এই পারস্পরিক কূটনৈতিক বোঝাপড়ার ফলে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রেসিডেন্ট ভুচিচ আরও উল্লেখ করেন যে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলো পুনর্গঠনে সার্বিয়া সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে। দুই দেশের মধ্যকার এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি গত দুই দশক ধরে আলোচনার টেবিলে রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সার্বিয়ার সদস্যপদ লাভের জন্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে এই চুক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কৃষি খাতের শুল্ক ও কোটা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ইউক্রেন এতদিন এই চুক্তিটি আটকে রেখেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে চুক্তিটি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা হয়েছে।
আসন্ন শীতে ইউক্রেনীয় জনগণের জন্য মানবিক সহায়তা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে সার্বিয়া। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান যে রুশ হামলায় ইউক্রেনের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বেসামরিক স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে সার্বিয়ার পক্ষ থেকে চিকিৎসা ও জ্বালানি খাতের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেওয়ায় ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এছাড়া দানিয়ুব করিডোরসহ বিভিন্ন যোগাযোগ ও লজিস্টিক প্রকল্প নিয়েও দুই নেতার মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্যে গতি আনবে।
বৈঠকে দুই দেশের পক্ষ থেকে পশুপাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সার্বিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয় এবং ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। তবে দুই নেতার এই বৈঠকে সামরিক সহযোগিতা বা অস্ত্র সরবরাহ সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়নি বলে পরিষ্কার করা হয়েছে। সার্বিয়া রাশিয়া থেকে সামরিক নির্ভরতা কমিয়ে ফরাসি যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পদক্ষেপ নিলেও ইউক্রেন সংকট নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রেখে চলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনে সার্বিয়া যেমন তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনছে, তেমনি ইউক্রেনের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করছে।
