টানা পাঁচ দিন ধরে চলা বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পর দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে মজুরি বোর্ড।
উচ্চ মজুরির দাবিতে বুধবার সকালে শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নেমে আসেন হাজার হাজার শ্রমিক। এ সময় কিছু বিক্ষোভকারী ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন, পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন এবং সড়ক অবরোধ করেন। অন্যদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শ্রমিকদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ।
মজুরি বোর্ডের পক্ষ থেকে সমঝোতার ঘোষণা আসার পর দুপুরের দিকে আন্দোলন কিছুটা শান্ত হয়। তবে শ্রমিকেরা অবিলম্বে কারখানায় ফিরে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবেন কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত বার্তা পাওয়া যায়নি।
ঘোষণার প্রকৃত অর্থ কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে ধোঁয়াশায় ছিলেন অনেক শ্রমিক। একতা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা কামরুল হাসান জানান, মজুরি বোর্ড কীভাবে কাজ করে তা অধিকাংশ শ্রমিকই জানেন না এবং তাদের বেতন আসলে বেড়েছে কি না, সে বিষয়ে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে চাইছেন।
এদিকে কারখানাগুলোতে কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদউল হাসান। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যেহেতু দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, তাই অস্থিরতা এবার কমে যাওয়া উচিত। কারখানা মালিকেরা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে চান না উল্লেখ করে তিনি জানান, বাধ্য হয়েই তাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক তৈরি করে থাকে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই আসে এই খাত থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে তাদের সবচেয়ে বড় বাজার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ব্লক, যেখানে ফ্রুট অব দ্য লুম থেকে শুরু করে লেভি স্ট্রাউস ও ভিএফ কর্পোরেশনের মতো কোম্পানিগুলো যুক্ত রয়েছে।
চার মিলিয়নের বেশি মানুষ কর্মরত এই খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ বর্তমান এই বিরোধ। বেতন, কাজের পরিবেশ এবং শ্রমিক অধিকার নিয়ে এই খাতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের মতে, আট শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত ও চিকিৎসাব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী দাম তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানের ১২ হাজার ৫০০ টাকার স্থলে ১৪০ শতাংশ বাড়িয়ে ন্যূনতম মাসিক ৩০ হাজার টাকা অর্থাৎ ২৪০ ডলার মজুরির দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।
গত রবিবার মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই দরকষাকষি বোর্ড গঠন করে সরকার। তবে বুধবারের বৈঠকে মজুরি ঠিক কতটা বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক প্রকাশ করেনি বোর্ড।
বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন শ্রমিকেরা, যাতে জানুয়ারি মাস থেকেই সংশোধিত বেতন পাওয়া সম্ভব হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মজুরি বোর্ডে উপস্থিত কারখানা মালিকদের প্রতিনিধিও এই বিষয়ে একমত হয়েছেন।
মজুরি বোর্ডে বিজিএমইএ-র প্রতিনিধি এবিএম শামসুদ্দিন নিশ্চিত করেছেন যে, ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে যাতে জানুয়ারি মাস থেকেই কর্মীরা বর্ধিত হারে বেতন পেতে পারেন।
গাজীপুর, মিরপুর, নারায়নগঞ্জ ও সাভারের মতো প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে এই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভিন জানান, চুক্তি ঘোষণার আগেই সাভারে ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা পুলিশের গাড়িতে আগুন দেন এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আহত করেন। দুই দিক থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক এসে পুলিশের ওপর হামলা চালায় বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, এই সংঘর্ষে সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে শ্রমিকদের অবহিত করতে সরকারের অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। মজুরি বোর্ডের পুরো প্রক্রিয়াটি শ্রমিকদের বোঝাতে সরকার, মালিক পক্ষ ও শ্রমিকদের নিয়ে একটি ত্রিমুখী ব্যবস্থা গঠনের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বলপ্রয়োগের বদলে যোগাযোগের মাধ্যমেই কেবল এই অস্থিরতা সামাল দেওয়া সম্ভব।
