শীতকাল ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি সংকট ও মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি এড়াতে সরকারি এবং বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব ও ওমান থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা করছে পাকিস্তান। মঙ্গলবার পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক এই পরিকল্পনার কথা জানান।
অস্থির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে নিরাপত্তা জোরদার এবং চোরাচালান রোধের অংশ হিসেবে গত মাসে দেশটির সঙ্গে ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়ার পর বিকল্প জ্বালানি নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। মার্কিন-ইরান যুদ্ধের কারণে আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এলপিজি আমদানির জন্য কোন কোন দেশের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আলী পারভেজ মালিক সম্ভাব্য বাজার হিসেবে সৌদি আরব ও ওমানের নাম উল্লেখ করেন।
ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনের পর সাংবাদিকদের তিনি জানান, ওমানে ইতিমধ্যে একবার সরকারি সফর করা হয়েছে এবং আরেকটি প্রতিনিধিদল খুব দ্রুত সেখানে যাচ্ছে। এ সময় তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারারও উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা দুজন মিলে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
আলী পারভেজ মালিক জানান, ওমানের সঙ্গে ইতিমধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যদিও এই চুক্তির আওতায় এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। জ্বালানি সরবরাহ বৈচিত্র্যময় করতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত মাসে ওমানের ওকি ট্রেডিং লিমিটেডের সঙ্গে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে পাকিস্তান। গত আগস্টে সরকারের অর্থনৈতিক সমন্বয় কমিটি এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছিল।
পাকিস্তানে বার্ষিক প্রায় ২৪ লক্ষ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যার দৈনিক পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার টন। কিন্তু দেশের ভেতর উৎপাদিত হয় মাত্র ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টন। আলী পারভেজ মালিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের চাহিদার অর্ধেক বা তারও বেশি অংশ আগে দেশের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে আমদানির মাধ্যমে মেটানো হতো। পাশাপাশি করাচির পোর্ট কাসিমের দুটি এলপিজি টার্মিনালের মাধ্যমে সমুদ্রপথেও বাড়তি সরবরাহ আসত।
সংবাদ সম্মেলনে আলী পারভেজ মালিক জানান, সরকারি ও ব্যবসায়িক চুক্তির মাধ্যমে পাইকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করতে পাকিস্তান স্টেট অয়েল, এসএসজিসি এলপিজি লিমিটেড এবং পাকিস্তান এলএনজি লিমিটেড—এই তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। সরকার থেকে সরকার এবং ব্যবসা থেকে ব্যবসা—উভয় মাধ্যমেই পাইকারি আমদানির বুকিং করার জন্য তাদের বলে দেওয়া হয়েছে।
আলী পারভেজ মালিক জানান, সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে বেশ ভালো অগ্রগতি সাধন করেছে, যদিও ঠিক কী পরিমাণ এলপিজি আমদানির আলোচনা চলছে বা চালানগুলো কবে নাগাদ পৌঁছাতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। ব্যবসায়ীরা যেন সংকটের সুযোগ না নিতে পারেন, সে জন্য সরবরাহ ও দাম নিয়ে কারসাজি বা সিন্ডিকেট গঠনের চেষ্টার বিরুদ্ধেও তিনি সতর্ক করেন।
ভোক্তা পর্যায়ে দাম সহনীয় রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের কোম্পানিগুলোর জন্য এলপিজি আমদানির বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আলী পারভেজ মালিক জানান, এখন থেকে এই খাতটি প্রতিযোগিতার জন্য উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোকেও এলপিজি আমদানিতে উৎসাহিত করা হবে।
মন্ত্রী জানান, আমদানি বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মাধ্যমে এলপিজির দাম প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৪০০ পাকিস্তানি রুপির মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আলী পারভেজ মালিক আরও জানান, শীতের মৌসুমে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে যখন গ্যাসের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন পাইপলাইন নেটওয়ার্কে সরবরাহ সচল রাখতে উচ্চমূল্যে এলএনজি ক্রয়ের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে সরকার।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাতারের দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফোর্স ম্যাজেক বা অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করার পর থেকে পাকিস্তান অতিরিক্ত চড়া মূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে, যা সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
