যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগের দিন হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত আকারের এই হামলা চালানো হয়। ভোটগ্রহণের পর ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিবেচনা করে আসছিলেন।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর কেশম ও হাঙ্গাম দ্বীপে এবং এর কাছাকাছি মূল ভূখণ্ডের বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা সোমবার জানান, জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভূখ থেকেই আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারকারী ইরানিদের লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়। ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে এমন হামলা চালিয়েছিল।
প্রায় দুই মাস পর যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে এমন আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছিল। ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে বিশ্ববাজারে পৌঁছানো থেকে বিরত রাখতে প্রণালীতে এখনো হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও নৌবহর অবস্থান করছে। এছাড়া আরও একটি বিমানবাহী রণতরী ও অতিরিক্ত সেনা মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে।
পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হওয়া এড়াতে বিভিন্ন কূটনৈতিক আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। আট মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে এবং ইরানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। মার্কিন মিত্ররাও এই যুদ্ধ পুনরায় শুরু না করার জন্য চাপ দিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকান পার্টির জন্য এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ এবং এর জেরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি বড় ধরনের রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এমন তিনজন ব্যক্তির বরা୍ত জানা গেছে, সপ্তাহান্তে এক ফোনালাপে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্পকে চাপ দিয়েছিলেন। তবে দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রণালীতে ইরানের হামলা বন্ধের বিনিময়ে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার একটি রূপরেখা নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা কাজ করছেন।
মার্কিন কর্মকর্তা হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করার আগেই সোমবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানান, আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি এবং ট্রাম্প উভয়েই আশাবাদী। ট্রাম্প অবশ্য বড় ধরনের হামলার হুমকি দেওয়া এবং তেহরানের সঙ্গে চুক্তি করার চেষ্টার মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মঙ্গলবার জানান, যুদ্ধ সমাপ্তির বিষয়ে তেহরানের দাবির জবাবে মার্কিন প্রতিক্রিয়া সন্তোষজনক ছিল না। মেজর জেনারেল মহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্তগুলো মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করলে, তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে এবং লেবাননসহ অন্যান্য অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করলে প্রণালী খুলে দেওয়া এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে তেহরান।
চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। একই সঙ্গে তিনি অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সুদৃঢ় ও যৌক্তিক জবাব দেওয়া হয়েছে এবং এখন যুদ্ধ এড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আমেরিকার।
