মিয়ানমার মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল কি না এবং তা গণহত্যা হিসেবে গণ্য হয় কি না, সে বিষয়ে আগামী ১৯ নভেম্বর রায় ঘোষণা করবে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারকরা গাম্বিয়ার আনা এই অভিযোগের বিষয়ে গত সাত বছর ধরে বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন।
গাম্বিয়ার যুক্তি হলো, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের দমনপীড়ন ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ গণহত্যা কনভেনশনের লঙ্ঘন। কোনো রাষ্ট্রে গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে বলে সন্দেহ হলে যেকোনো দেশ যেন সতর্কবার্তা দিতে পারে, চুক্তির এমন শর্তের আওতায় এই মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত শুনানির সময় গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাউদা জাল্লো আদালতকে জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গারা কল্পনাতীত ভয়াবহ সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই বিচারপ্রক্রিয়া বাস্তব মানুষ এবং বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে এবং এই জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার লক্ষ্যেই হামলা চালানো হয়েছে।
মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। দেশটির কর্মকর্তাদের দাবি, এক ডজন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হওয়ার পর বিদ্রোহীদের সামরিক অভ্যুত্থান প্রতিহত করতেই তাদের পদক্ষেপ পরিচালিত হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের মন্ত্রী কো কো হ্লাইং আদালতে বলেছেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। তিনি উল্লেখ করেন, আবেগঘন ভাষা এবং অস্পষ্ট তথ্যভিত্তিক চিত্র কড়াকড়িভাবে তথ্য উপস্থাপনের বিকল্প হতে পারে না।
এর আগে ২০১৯ সালের শুনানিতে হেগের পিস প্যালেসে আদালতের সামনে বক্তব্য রেখেছিলেন তৎকালীন বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী এই নেত্রী যুক্তি দিয়েছিলেন যে এই মামলার কারণে সংকট নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে এবং দমনপীড়নের পেছনে কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক বা গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল না।
বর্তমানে ৮১ বছর বয়সী সু চি আসন্ন রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত থাকছেন না। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই রাজধানী নেপিডোতে তিনি গৃহবন্দী অবস্থায় রয়েছেন।
সেনাবাহিনীর দমনপীড়ন এবং বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের হামলায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস করছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরের কেন্দ্রস্থল।
গাজার অভিযানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা পৃথক একটি গণহত্যা মামলা আদালত কীভাবে পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে ধারণা পেতে আইসিজে-র এই সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আইসিজে-র নিজস্ব রায় কার্যকর করার ক্ষমতা না থাকলেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রায় গেলে দেশটির সামরিক জান্তার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে এবং রোহিঙ্গারা ন্যায়বিচার পাবে।
এর আগে ২০২০ সালে আইসিজে মিয়ানমারকে হত্যা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংসাত্মক জীবনযাত্রা চাপিয়ে দেওয়া রোধসহ গণহত্যা প্রতিরোধে তাদের ক্ষমতার মধ্যে থাকা সব ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিল। পাশাপাশি বিচারকরা মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তোলা এখতিয়ারসংক্রান্ত আপত্তিও খারিজ করে দিয়েছিলেন।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যান্য আইনি সংস্থাও। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলি মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছেন এবং সর্বজনীন বিচারব্যবস্থার আওতায় আর্জেন্টিনায় একটি পৃথক মামলা চলমান রয়েছে।
