ভবিষ্যৎ সংকটে জর্জরিত অবকাঠামো, নাগালের বাইরে চলে যাওয়া বিদ্যুৎ সংকট এবং পানির তীব্র সংকটের কারণে ভোটারদের গভীর অসন্তোষের মুখে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকরা। ১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে কৃষ্ণাঙ্গ প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় আসা ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের এই দলটি সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে এক তৃতীয়াংশেরও কম ভোট পেতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। ২০২১ সালের স্থানীয় নির্বাচনে দলটি পেয়েছিল ৪৫.৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই হার ছিল ৪০.২ শতাংশ।
ভোটের এই খণ্ডিত চিত্র বলছে, কয়েকটি শহরের কোয়ালিশন সরকার গঠনে এএনসি নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারলেও অনেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। দেশটির ২৫৭টি পৌরসভার বেশিরভাগজুড়েই আগে থেকেই অস্থিতিশীল জোট সরকারের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় এই প্রশাসনগুলোতে নেতৃত্বের দ্রুত পরিবর্তনই মূলত নিম্নমানের জনসেবার মূল কারণ।
প্রায় ৪৮ লক্ষ মানুষের শহর জোহানেসবার্গে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তীব্র পানির সংকট চলছে এবং বিগত দশ বছরে শহরটি দশ জন মেয়র দেখেছে। প্রতিবেশী একুরহুলেনি পৌরসভায় ২০২১ সাল থেকেই পরিবর্তন হয়েছে তিনজন মেয়র। উত্তর দিকে রাজধানী প্রিটোরিয়া সংলগ্ন শওয়ানে পৌরসভায় ২০২০ সাল থেকে মেয়র পদটি চারবার হাতবদল হয়েছে। গত অক্টোবর মাসে শওয়ানের পূর্বাঞ্চলের ব্রংকহর্স্টস্প্রুইটে দূষিত পানির কারণে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল রোগে আক্রান্ত হন আটশোর বেশি মানুষ।
জোহানেসবার্গ, একুরহুলেনি এবং শওয়ানে অবস্থিত দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র গাওতেঙে। শ্বেতাঙ্গ নেতৃত্বাধীন মধ্যডানপন্থী ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স এই তিনটি মেট্রো অঞ্চলেই এগিয়ে থাকলেও ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পেতে ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সরকারের মতো গাওতেঙেও ডিএর সঙ্গে কাজ করার পক্ষে রয়েছে এএনসির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, যেখানে দল দুটি প্রধান অংশ গঠন করেছে। তবে স্থানীয় এএনসি নেতারা ডিএর সঙ্গে এই ধরনের কোনো জোটে যাওয়ার প্রকাশ্য বিরোধিতাই করেছেন।
বর্তমানে চরম বামপন্থী ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটার্স, পপুলিস্ট পেট্রিয়টিক অ্যালায়েন্স এবং অ্যাকশনএসএর সঙ্গে জোট বেঁধে গাওতেঙের তিনটি মেট্রো পরিচালনা করছে এএনসি। জোহানেসবার্গে ডিএ প্রার্থী হেলেন জিল বেশ জোরেশোরে প্রচার চালান, যার মধ্যে রাস্তার খানাখন্দে স্নরকেলিং করা কিংবা প্লাবিত রাস্তায় কায়াকিং করার মতো ভাইরাল স্টান্টও ছিল। এত সব প্রচারের পরও কেপ টাউনের সাবেক এই মেয়র ঔপনিবেশিকতা নিয়ে তার অতীতের কিছু বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে অনেক কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের অনাস্থার মুখে পড়েন। ২০০৬ সাল থেকে ডিএর শাসনাধীন কেপ টাউনে আবাসন খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ায় ভোটাররা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
প্রায় ১০ শতাংশ সমর্থন নিয়ে অ্যাকশনএসএ দলের নেতৃত্বদানকারী জোহানেসবার্গের সাবেক ডিএ মেয়র হারমান মাশাবা হেলেন জিলের সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। মাশাবা জিলকে বর্ণবাদী হিসেবে অভিহিত করলেও তিনি তা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। এদিকে অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলের জেরে জোহানেসবার্গের মেয়র পদের জন্য তিনজন সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনে নামে এএনসি।
বন্দরনগরী ডারবান সংলগ্ন ইথেকউইনি মেট্রোতে সাবেক এএনসি সভাপতি জ্যাকব জুমার উমখোন্তো ওয়ে সিজওয়ে পার্টি ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। নানা দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়েও তা অস্বীকার করে আসা ৮৪ বছর বয়সী জুমা তার সাবেক দল থেকে প্রচুর ভোট নিজের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছেন। এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনে ইথেকউইনটিতে ৪২ শতাংশ ভোট পেলেও বুধবারের নির্বাচনের আগে এএনসির অবস্থান নেমে আসে প্রায় ১০ শতাংশে।
কেপ টাউনে ডিএ তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হলেও, আকাশছোঁয়া আবাসন খরচের কারণে ভোটার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় ২০২১ সালের পাওয়া ৫৮ শতাংশ ভোট হয়তো এবার তারা ধরে রাখতে পারবে না। সরাসরি মেয়র নির্বাচন না হলেও কাউন্সিলর এবং দল নির্বাচনের এই ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করতে দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন কমিশনের এক সপ্তাহ সময় লাগবে। ফলাফল ঘোষণার পর কাউন্সিল গঠন এবং মেয়র নির্বাচনের জন্য দলগুলো সময় পাবে দুই সপ্তাহ।
