মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের আঁচ এবার সরাসরি গিয়ে লেগেছে জাপানের সুপারমার্কেটগুলোর শেলফে। তবে এটি কেবল পণ্যের দাম বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং পণ্যের বাহ্যিক রূপকেও বদলে দিচ্ছে। জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় স্ন্যাকস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান `ক্যালবি` (Calbee) ঘোষণা করেছে যে, তারা তাদের ১৪টি জনপ্রিয় পণ্যের প্যাকেজিং সাময়িকভাবে সাদা-কালো বা সাদামাটা রঙে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুদ্রণ কালির তীব্র সংকটের কারণেই এমন নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে টোকিও ভিত্তিক এই কোম্পানিটি।
এই সংকটের মূল কারণ লুকিয়ে আছে সুদূর ইরান ও ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত বন্ধ রয়েছে। সারা বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। এই হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় ‘ন্যাপথা’ (Naphtha) নামক একটি বিশেষ পেট্রোলিয়াম উপজাতের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মুদ্রণ কালি তৈরির জন্য রেজিন এবং দ্রাবক হিসেবে ন্যাপথা অপরিহার্য। জাপান তার প্রয়োজনীয় ন্যাপথার অন্তত ৪০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যার ফলে জাপানি কোম্পানিগুলো এখন সরাসরি সরবরাহের ঘাটতিতে পড়েছে।
ক্যালবি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে কাঁচামাল সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাজারের চাহিদা মেটাতে এবং পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতেই তারা প্যাকেজিংয়ের জৌলুস কমিয়ে খরচ বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আগামী ২৫ মে থেকে জাপানের দোকানগুলোতে এই নতুন সাদা-কালো প্যাকেটের ক্যালবি পটেটো চিপস পাওয়া যাবে। যদিও জাপানি সরকারের ডেপুটি চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি কেই সাতো দাবি করেছেন যে, তারা অন্যান্য দেশ থেকে বিকল্প আমদানি বাড়িয়েছেন, তবুও কালির চড়া দাম ও উৎপাদন ঘাটতি সামলানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু জাপান নয়, বৈশ্বিক মুদ্রণ কালি নির্মাতারাও এখন বিপাকে। আমেরিকার সান কেমিক্যাল (Sun Chemical) এবং জার্মানির হুবারগ্রুপ (Hubergroup) ইতিমধ্যে কালির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ন্যাপথা কেবল কালিতেই নয়, বরং প্লাস্টিক, সিন্থেটিক রাবার এবং উচ্চমানের পেট্রোল তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। ফলে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে স্ন্যাকসের প্যাকেট থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম ও মানের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মার্কিন নৌবাহিনী বর্তমানে ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে এবং ইরানি বন্দরে প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। তবে গত ৮ এপ্রিলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর এবং পাকিস্তান সম্মেলনে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হচ্ছে, ততক্ষণ জাপানের মতো দেশগুলোকে এমন সৃজনশীল কিন্তু ‘বর্ণহীন’ সমাধানের পথেই হাঁটতে হতে পারে।
