রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩

গাজার শেখ ইজলিনে আঙুর চাষে ফিরেছেন ফিলিস্তিনি কৃষক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ২৯, ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

গাজার শেখ ইজলিনে আঙুর চাষে ফিরেছেন ফিলিস্তিনি কৃষক

ফিলিস্তিনের গাজা সিটির শেখ ইজলিন এলাকায় দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর নিজস্ব আঙুর বাগানে ফিরে এসে ফসল সংগ্রহ শুরু করেছেন পঞ্চাশ বছর বয়সী কৃষক খালেদ আবু মাদিন, যা আল জাজিরার প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে। সকালের প্রথম আলোয় বাগানের সবুজ সারির মধ্যে হেঁটে বেড়ানো এবং পাকা আঙুর সংগ্রহ করা তার কাছে কেবল একটি মৌসুমী ফসল কাটা নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া জীবন ফিরে পাওয়ার সমান। যুদ্ধ শুরুর আগে তার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলে আঙুর ও ডুমুর চাষ করে আসছে এবং বাপ-দাদার এই ভিটেমাটি ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তিনি। অতীতে তিনি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পেশায় যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা করতে পুরোপুরি কৃষিকাজে মন দেন।

গত দুই হাজার তেইশ সালের অক্টোবর মাসে সংঘাত শুরু হওয়ার পর তার স্ত্রী ও সন্তানেরা বিদেশে চলে গেলেও খালেদ নিজের জমি এবং অসুস্থ বৃদ্ধ মায়ের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। পরবর্তীতে তীব্র বোমা হামলা ও সামরিক হুমকির মুখে তাকে বাধ্য হয়ে মধ্য গাজার দেইর আল বালাহ এলাকায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল। কিন্তু দূর অঞ্চলে থেকেও তার মন পড়েছিল এই পৈতৃক জমির মাটিতেই এবং চরম ঝুঁকির মধ্যেও তিনি বারবার ফিরে আসার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। একবার তো মাঠের পরিস্থিতি দেখতে আসার সময় সামরিক বাহিনীর গুলিতে তার এক কর্মী গুরুতর আহত হন এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়, যা তাদের কিছুক্ষণের জন্য পিছু হটতে বাধ্য করেছিল।

যুদ্ধবিধ্বস্ত উত্তর গাজার এই অঞ্চলে ফিরে আসার পর তিনি দেখতে পান যে তার বহু যত্নে গড়া জমির প্রায় ষাট শতাংশ গাছই বুলডোজার ও হামলায় ধ্বংস বা উপড়ে ফেলা হয়েছে। পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী গাছগুলো শেকড়সহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো দৃশ্যটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তা সত্ত্বেও তিনি এবং তার সহযোগীরা হাল ছাড়েননি এবং মাটির নিচে বেঁচে থাকা শেকড় থেকে নতুন চারা ও কুঁড়ি বের করে আনার কঠিন কাজ শুরু করেন। প্রয়োজনীয় কীটনাশক, সার ও কৃষি সরঞ্জামের তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও তারা নিজস্ব উদ্যোগে জমি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালান।

বর্তমান মৌসুমে উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় মাত্র চল্লিশ শতাংশের মতো হলেও কৃষকদের কাছে এটি এক বিশাল মানসিক জয়। স্থানীয় বাজারে এই ফলের দাম অনেক বেশি হলেও দীর্ঘ ধ্বংসস্তূপের মাঝে এই সবুজ পাতার সমারোহ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। শেখ ইজলিন এলাকাটি ঐতিহাসিকভাবে আঙুর ও ডুমুরের জন্য বিখ্যাত ছিল এবং এই উৎপাদনের পুনরুজ্জীবন পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। খালেদ আবু মাদিনের মতে, এই মাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক এমন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন যা কোনোভাবেই ছিন্ন করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় অন্যান্য কৃষকরাও নিজেদের ধ্বংসপ্রাপ্ত জমিগুলো ফিরিয়ে আনতে অনুরূপ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে নানা ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে গাজার সাধারণ মানুষ চরম খাদ্যসংকট ও অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যেও কৃষিকাজের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে শেখ ইজলিনের সবুজ আঙুর বাগানগুলো, যা ধ্বংসস্তূপের মাঝেও নতুন জীবনের বারতা নিয়ে আসছে। আগামী দিনগুলোতে এই খাতের পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার নির্ভর করছে সামগ্রিক পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা এবং অবাধ মানবিক সহায়তার ওপর।

banner
Link copied!