শরীরের নিজস্ব জীববৈজ্ঞানিক ঘড়ির ছন্দ মেনে সন্ধ্যা ৬টায় রাতের খাবার সম্পন্ন করলে তা দ্রুত ওজন কমাতে, ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে এবং দীর্ঘায়ু লাভে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য মঙ্গলবার টেলিগ্রাফের এক বিশেষ স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে চিকিৎসা গবেষকেরা জানিয়েছেন, মানবদেহের স্বাভাবিক মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে ‘ক্রোনোনিউট্রিশন’ বা সময়ভিত্তিক পুষ্টিবিজ্ঞান এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। শরীরের প্রাকৃতিক নিয়মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাবার গ্রহণের এই পদ্ধতিটি বর্তমানে জাপানসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, রাতে দেরিতে ভারী খাবার খাওয়ার দীর্ঘদিনের অভ্যাসটি পরিবর্তন করার মাধ্যমে মানুষ বহু জটিল দীর্ঘমেয়াদী রোগ থেকে অনায়াসে মুক্তি পেতে পারে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট ও প্রখ্যাত চিকিৎসা সাংবাদিক ডক্টর ডেভিড কক্সের নতুন বই ‘দ্য এজ কোড’-এ মানুষের খাদ্য গ্রহণ এবং বার্ধক্য প্রতিরোধের বিজ্ঞানকে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কার্ডিফ মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড হিউম্যান জেনেটিক্সের প্রধান শিক্ষক মানিন্দর আহলুওয়ালিয়া এই বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, মানব সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে মানুষ মূলত সূর্যের আলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ ও জীবনযাপন করার জন্য তৈরি হয়েছে। আধুনিক যুগে এসে মানুষ দিনের সিংহভাগ ক্যালোরি গ্রহণ করে রাতের শেষ ভাগে, যখন শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা বায়োলজিক্যাল ক্লক ঘুমের প্রস্তুতি নেয় এবং পরিপাককারী এনজাইমগুলোর কার্যক্ষমতা সকালের তুলনায় অনেক হ্রাস পায়।
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে টেক্সাসের একদল বিজ্ঞানী মানবদেহে ‘ক্লক’ নামক একটি বিশেষ জিন আবিষ্কার করেন, যা আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের দৈনিক প্রাকৃতিক ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে। ক্যালিফোর্নিয়ার সল্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল স্টাডিজের ক্রোনোবায়োলজিস্ট অধ্যাপক সাচিন পান্ডা জানান, দুপুরের পর অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, রাতে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং দেরিতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস আমাদের শরীরের এই স্বাভাবিক ছন্দকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেয়। তার মতে, সন্ধ্যা ৬টা হলো রাতের খাবার শেষ করার privatisation সবচেয়ে আদর্শ সময়। রাত ৮টা বা তার পরে ভারী খাবার খেলে তা শরীরের জৈবিক দিনকে দীর্ঘায়িত করে এবং কোষগুলোর গভীর রাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেরামত ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
অধ্যাপক সাচিন পান্ডা বিগত ২০ বছর ধরে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে তার সমস্ত খাবার গ্রহণ করার একটি কঠোর রুটিন মেনে চলছেন। তিনি জানান, এই বিশেষ নিয়মটি তাকে কোনো প্রকার অতিরিক্ত ধকল ছাড়াই ১০ কেজির বেশি ওজন কমাতে এবং সেই ওজন স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। এর ফলে তিনি মধ্যবয়সের সাধারণ রোগ যেমন উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগের ঝুঁকি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে পেরেছেন। হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রোনোনিউট্রিশন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ইউ তাহারা এক গবেষণার বরাতে জানান, একই খাবার সকালে এবং রাতে খাওয়ার ফলে শরীরে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব পড়ে। রাতে খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনেক বেশি বৃদ্ধি পায় এবং ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণে দীর্ঘ বিলম্ব ঘটে, যা কালক্রমে প্রি-ডায়াবেটিস ও অতিরিক্ত মেদবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সময়ভিত্তিক এই পুষ্টিবিজ্ঞান কেবল শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের সামগ্রিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষায় সমানভাবে কার্যকর। গবেষকেরা দেখেছেন, যারা দিনের প্রথমার্ধে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করেন তাদের পেটের অন্ত্রে স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া বা মাইক্রোবায়োমের চমৎকার ভারসাম্য তৈরি হয়, যা সুস্থ দীর্ঘায়ুর অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। জাপানি বিজ্ঞানীরা বার্ধক্যজনিত পেশীর ক্ষয় রোধ করতে সকালের নাস্তায় ডিম, মাছ কিংবা এক গ্লাস দুধের মতো প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার রাখার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন। কর্মজীবী মানুষদের জন্য যদি ঠিক সন্ধ্যা ৬টায় রাতের খাবার খাওয়া সম্ভব না-ও হয়, তবে ঘুমানোর অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা, যা সুস্থ ও রোগমুক্ত জীবনের পথ সুগম করবে।
