মসজিদ কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়। এটি মুমিনের আত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য উদ্যান। যখন কোনো বান্দা নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত শুরু করেন, তখন মসজিদের দেয়াল, মেহরাব এবং মুসল্লিদের সঙ্গে তার এক অদৃশ্য আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এই অনুভূতির টান তাকে বারবার আল্লাহর ঘরের দিকে টেনে নিয়ে আসে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যখন সালাত ও জিকিরের জন্য মসজিদে অবস্থান করে, তখন আল্লাহ তার প্রতি এতটাই আনন্দিত হন, যেমন প্রবাসী ব্যক্তি তার পরিবারে ফিরে এলে তারা তাকে পেয়ে আনন্দিত হয় (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০০)।
এই হাদিসে ব্যবহৃত তাওয়াত্বনা শব্দটির অর্থ হলো মসজিদকে স্বদেশের মতো এমনভাবে ঠিকানা বানিয়ে নেওয়া, যার প্রতি বান্দা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন এবং এখানে অবস্থান করলে তিনি প্রশান্তি লাভ করেন। আর তাবাশবাশা শব্দটির অর্থ হলো অত্যন্ত হাসিমুখে ও পরম মমতায় কাউকে বরণ করে নেওয়া। প্রবাসে কাটানো দীর্ঘ সময় পর প্রিয়জন যখন ঘরে ফেরে, তখন পরিবারের সদস্যরা তাকে যেভাবে পরম আদরে জড়িয়ে ধরেন, সেরা আসনটি দেন এবং খুশিতে অশ্রুসিক্ত হন, ঠিক তেমনি একজন মুমিন যখন ওজু করে মসজিদের দিকে পা বাড়ান, তখন আসমানের মালিক তাকে রাজকীয় মেহমান হিসেবে স্বাগত জানান।
মসজিদের বারান্দায় পা রাখার সময় এই অনুভূতি জাগ্রত করা জরুরি যে, আমি আল্লাহর মেহমান হিসেবে তাঁর ঘরে প্রবেশ করছি। মসজিদের পরিবেশকে অন্তর দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলে দেখা যায়, এখানকার বাতাস যেন বাড়ির সাধারণ বাতাসের চেয়েও প্রশান্তিময়। মনটাকে এমন হালকা ও প্রশান্ত অনুভব করা যায়, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। যদি অনুভূতির শক্তি দিয়ে মসজিদকে এভাবে উপলব্ধি করা যায়, তবে একটি জীর্ণ কুঁড়েঘরের মসজিদও তখন মানুষের কাছে রাজপ্রাসাদের চেয়েও বেশি মোহনীয় মনে হবে। এই উপলব্ধির চূড়ায় পৌঁছেছিলেন আমাদের পূর্বসূরিরা।
প্রখ্যাত তাবেঈ রবি ইবনে খুসাইম রহ. বলেছেন, আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গের চেয়ে মসজিদের চড়ুই পাখির ডাকের মাধ্যমে বেশি প্রশান্তি অনুভব করি (মাওসুআতুল আখলাক, ১/১৩৩)। তাদের এই উপলব্ধি ছিল তাদের বিশ্বাসের গভীরে প্রোথিত। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, ৪০ বছর যাবত তার জামাতের সালাত মিস হয়নি। এবং ৩০ বছর যাবত মুয়াজ্জিন যখন আজান দিয়েছে, তখন তিনি সালাতের জন্য মসজিদে উপস্থিত থেকেছেন (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা ৪/২২১)।
আমরা যখন অন্তরের চোখ দিয়ে মসজিদের পরিবেশকে পর্যবেক্ষণে অভ্যস্ত হব এবং গভীরভাবে অনুভব করতে পারব যে আমরা আল্লাহর ঘরের একজন স্থায়ী বাসিন্দা এবং আমাদের আগমনে খোদ আল্লাহ আনন্দিত হচ্ছেন, তখন দুনিয়ার কোনো ব্যস্ততা বা পার্থিব কাজ আমাদের মসজিদের চৌকাঠ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না। মসজিদের এই আধ্যাত্মিক পরিবেশই আমাদের জীবনের প্রকৃত প্রশান্তি বয়ে আনতে পারে। নিয়মিত উপস্থিতি এবং মনোযোগের সঙ্গে মসজিদের প্রতি মমত্ববোধ তৈরি করাই একজন মুমিনের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। আল্লাহর ঘরের প্রতি এই ভালোবাসা ও আনুগত্য আমাদের ঈমানকে করবে আরও সুদৃঢ় এবং আত্মাকে করবে প্রফুল্ল।
