ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (UCL) ইনস্টিটিউট ফর কগনিটিভ নিওরোসায়েন্সের পরিচালক অধ্যাপক সোফি স্কট তার সারাজীবনের ওজন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছেন এক আধুনিক চিকিৎসায়। দীর্ঘকাল ধরে পারিবারিক স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের সাথে লড়াই করার পর তিনি ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ওজন কমানোর ইনজেকশন মাউঞ্জ্যারো (Mounjaro) নেওয়া শুরু করেন। একজন নিওরোসায়েন্টিস্ট হিসেবে তিনি জানতেন মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে ক্ষুধার সংকেত গ্রহণ করে, কিন্তু নিজের ওপর এই ওষুধের প্রভাব দেখে তিনি নিজেই বিস্মিত হয়েছেন। তার ওজন এক সময় প্রায় ১৭ স্টোন ৭ পাউন্ডে পৌঁছেছিল, যা এখন অবিশ্বাস্যভাবে কমে এসেছে।
এই ইনজেকশন তার শরীর থেকে মোট ৬ স্টোন ৪ পাউন্ড ওজন ঝরিয়ে দিয়েছে।
সোফি স্কট জানিয়েছেন, তার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ‘ফুড নয়েজ’ বা সারাক্ষণ খাবারের কথা চিন্তা করা। তার ভাষায়, এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মস্তিষ্ক অবিরত ফ্রিজে কী আছে বা পরবর্তী বেলায় কী খাওয়া যায়—তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মাউঞ্জ্যারো ইনজেকশনটি মূলত GLP-1 হরমোনের অনুকরণ করে কাজ করে, যা খাবার খাওয়ার পর পেট ভরা থাকার অনুভূতি দেয়। বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি জানতেন এই ওষুধ সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে না, তবুও এটি তার চিন্তার জগতকে আমূল বদলে দিয়েছে। খাবারের চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ায় তার মস্তিষ্কে এখন অনেক বেশি ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে, যা তাকে আগের চেয়ে সুখী করেছে।
আগে তার দিনের শুরু হতো পাউরুটি ও মারমাইট দিয়ে, কিন্তু এখন তার খাদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি এখন পাউরুটি বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে রাইস কেক, ডাল, বাদাম এবং প্রচুর শাকসবজি খেতে পছন্দ করেন। সোফি জানান, ইনজেকশন নেওয়ার পর তার জিভের রুচি বদলে গেছে; কার্বোহাইড্রেট জাতীয় নরম খাবার এখন তার কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হয় না। পরিবর্তে তিনি এখন মচমচে ও হালকা খাবারের প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়েছেন। তার জীবন থেকে মিষ্টি এবং চিপসের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবারের আকর্ষণ চিরতরে বিদায় নিয়েছে।
শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি তার কর্মক্ষমতাও বেড়েছে বহুগুণ।
আগে সামান্য পথ হাঁটতে গেলেই সোফি ক্লান্ত হয়ে পড়তেন এবং বাসের ওপর নির্ভর করতেন। এখন তিনি প্রতিদিন কয়েক মাইল হাঁটতে পারেন এবং আগের চেয়ে অনেক দ্রুত দৌড়াতে পারেন। তার হার্ট রেট এখন ব্যায়ামের সময় অনেক বেশি কার্যকর থাকে, যা ওজন বেশি থাকার সময় সম্ভব ছিল না। এমনকি তার পায়ের আকারও আগের চেয়ে ছোট হয়ে গেছে, যার ফলে পুরনো পছন্দের জুতো এখন অনায়াসেই পরতে পারছেন। এই পরিবর্তনগুলো তার জীবনে এক নতুন আনন্দের সঞ্চার করেছে।
তবে এই ইনজেকশনের সহজলভ্যতা ও খরচ নিয়ে তিনি কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সোফি বর্তমানে ব্যক্তিগতভাবে এই ওষুধ কিনছেন, কারণ তার চিকিৎসকের মতে তিনি এনএইচএস (NHS) থেকে বিনামূল্যে এই সেবা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। তিনি মনে করেন, টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো জটিল সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই সাধারণ মানুষের জন্য এই ওষুধের বাধা দূর করা উচিত। এনএইচএস যদি আরও ব্যাপকভাবে এই ইনজেকশন ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তবে তা জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে। সোফি নিজেও ভবিষ্যতে এই ইনজেকশন পুরোপুরি বন্ধ করতে চান না, কারণ তিনি ভয় পান যে ওষুধ ছেড়ে দিলে তার ‘ফুড নয়েজ’ আবার ফিরে আসতে পারে।
