মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

উদীয়মান সূর্যের দেশ জাপানে কেন বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৩০, ২০২৬, ১২:৫০ এএম

উদীয়মান সূর্যের দেশ জাপানে কেন বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা

জাপানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলাম ধর্মের প্রতি স্থানীয় নাগরিকদের আগ্রহ এবং মুসলিম জনসংখ্যা অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সোমবার আল জাজিরা এবং প্রথম আলোর যৌথ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে বৌদ্ধ ও শিন্তো সংস্কৃতির এই দেশটিতে বর্তমানে ইসলাম এক নতুন সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। টোকিও এবং ওসাকাসহ প্রধান শহরগুলোতে মুসলিমদের উপস্থিতি এখন বেশ চোখে পড়ার মতো যা দেশটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। গবেষকদের মতে এই পরিবর্তনের পেছনে গভীর ঐতিহাসিক যোগাযোগ এবং সমকালীন সামাজিক মূল্যবোধের এক চমৎকার সমন্বয় কাজ করছে।

বিভিন্ন গবেষণা এবং স্থানীয় প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় তিন লাখ থেকে চার লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে যা গত এক দশকের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার কারণে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন মসজিদ এবং হালাল খাবারের দোকানের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য কিছু প্রশাসনিক সংকটও তৈরি হয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হলো মৃতদেহ দাফন করার জন্য উপযুক্ত কবরস্থানের অভাব। জাপানি সমাজে সাধারণত মৃতদেহ দাহ করার নিয়ম প্রচলিত থাকায় ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করার বিষয়টি স্থানীয় পৌরসভাগুলোর সাথে একটি জটিল আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

জাপানি জনগণের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার একটি প্রধান কারণ হলো তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের সাথে ইসলামি জীবনদর্শনের গভীর নৈতিক মিল। জাপানি সমাজ পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত যা তাদের ওসোজী বা পরিচ্ছন্নতা সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই জীবনযাত্রার সাথে ইসলামের পবিত্রতা এবং আখলাক বা নৈতিক চরিত্রের ধারণার সরাসরি সাদৃশ্য রয়েছে। অনেক স্থানীয় জাপানি নাগরিক মনে করেন যে ইসলাম তাদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধগুলোকেই আরও আধ্যাত্মিক ও সুসংগঠিত রূপ দেয়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে জাপান ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যকার সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল এক মানবিক অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে যা ১৮৯০ সালের এর্তুগরুল জাহাজ দুর্ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। অটোমান সাম্রাজ্যের এই যুদ্ধজাহাজটি জাপান সফর শেষে ফিরে যাওয়ার সময় এক ভয়াবহ টাইফুনের কবলে পড়ে ডুবে যায় এবং এতে শত শত নাবিক প্রাণ হারান। সে সময় জাপানের উপকূলীয় এলাকার সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন বাজি রেখে জীবিত তুর্কি নাবিকদের উদ্ধার করে মানবিক সহায়তা প্রদান করেন এবং পরবর্তীতে তাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি দুই সভ্যতার মধ্যে একটি স্থায়ী বন্ধুত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিল যা আজও স্মরণ করা হয়।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিশেষ করে ১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে জাপানে ইসলামি গবেষণার এক স্বর্ণযুগ শুরু হয় যখন দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানে মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলাম নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনা শুরু হয়। এই সময়েই প্রথম জাপানি ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ সম্পন্ন হয় এবং ১৯৩৮ সালে টোকিওতে ঐতিহাসিক কামি মসজিদ নির্মিত হয় যা বর্তমানেও দেশটির সবচেয়ে বড় এবং দৃষ্টিনন্দন ইসলামি স্থাপত্য হিসেবে পরিচিত। এই মসজিদটি কেবল নামাজের স্থানই নয় বরং অমুসলিম জাপানিদের জন্য ইসলাম সম্পর্কে জানার একটি প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

আধুনিক যুগে এসে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসার জাপানি তরুণদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জাপানি ভাষায় অনূদিত ইসলামি সাহিত্য এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটর্মে স্থানীয় ভাষায় তৈরি ইসলামি কনটেন্ট এখন খুব সহজেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি মুসলিম অভিবাসীদের সাথে জাপানি নাগরিকদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে একটি দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলিম সমাজ গড়ে উঠছে যারা একই সাথে জাপানি সংস্কৃতি এবং ইসলামি আত্মপরিচয় ধারণ করছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক বাস্তবতায় জাপানি প্রশাসন দেশটির দীর্ঘদিনের আইনি ও দাফন সংক্রান্ত জটিলতাগুলো কত দ্রুত সমাধান করতে পারবে।

banner
Link copied!