মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের বড় ধাক্কা, বহাল রইলেন লিসা কুক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৩০, ২০২৬, ১২:১০ এএম

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের বড় ধাক্কা, বহাল রইলেন লিসা কুক

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সোমবার ওয়াশিংটনে ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজিরবিহীন প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। মার্কিন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কর্তৃক মনোনীত এবং দেশের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণবর্ণের নারী গভর্নর লিসা কুককে পদ থেকে অপসারণের এই আইনি লড়াইটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে ট্রাম্পের এই বিতর্কিত নির্বাহী আদেশকে ব্লক করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে রায় দেয়।

আদালতের ৫-৪ ব্যবধানের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাহী ক্ষমতা সম্প্রসারণের একক প্রচেষ্টায় একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯১৩ সালে মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক দেশের এই শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো সায়ত্তশাসিত ফেডারেল রিজার্ভ কর্মকর্তাকে সরাসরি বরখাস্ত করার এটিই ছিল কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চেষ্টা। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নিযুক্ত রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট কাভানো আদালতের অন্য তিন উদারপন্থী বিচারপতির সাথে যোগ দিয়ে ট্রাম্পের এই বরখাস্তের আদেশকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করেন। অন্যদিকে আদালতের অন্য চার রক্ষণশীল বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো, নিল গোরসুচ এবং অ্যামি কোনি ব্যারেট এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে তাদের ভিন্নমত পোষণ করেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের আগস্ট মাসে ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুকের বিরুদ্ধে আবাসন ঋণ বা বন্ধকী জালিয়াতির অপ্রমাণিত অভিযোগ এনে তাকে পদ থেকে অপসারণের বিতর্কিত উদ্যোগ নিয়েছিলেন। লিসা কুকের আইনি দল তাৎক্ষণিকভাবে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতে আপিল করে এবং দাবি করে যে এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের ইচ্ছানুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় আর্থিক নীতিকে প্রভাবিত করার একটি কৃত্রিম অজুহাত হিসেবে এই অভিযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এর আগে ট্রাম্প কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে তৎকালীন চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধেও একটি অপরাধমূলক তদন্ত শুরু করেছিলেন যা পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার মুখে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তুলে নেওয়া হয়।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে দেওয়া রাষ্ট্রে উল্লেখ করেন যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিসা কুককে আইন অনুযায়ী প্রাপ্য কোনো আইনি বা পদ্ধতিগত সুরক্ষা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় লিসা কুক তার বিরুদ্ধে আনা অর্থনৈতিক অভিযোগগুলোর যথাযথ ও আইনানুগ জবাব দেওয়ার সুযোগ পাননি। রবার্টস আরও স্পষ্ট করেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছাধীন কোনো সাধারণ কর্মচারী নন এবং তারা সংবিধবিধান অনুযায়ী ১৪ বছরের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের কেবল উপযুক্ত এবং প্রমাণিত গুরুতর অপরাধ ছাড়া পদ থেকে অপসারণ করা আইনত অসম্ভব এবং তা দেশের ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির পরিপন্থী।

আদালতের এই চূড়ান্ত রায়কে স্বাগত জানিয়ে লিসা কুক এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেন যে সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতি নির্ধারণের অধিকারকে সুরক্ষিত করেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে এই পুরো বিষয়টি কখনোই কয়েক বছর আগের কোনো আবাসন নথির সত্যতা নিয়ে ছিল না, বরং এটি ছিল তাকে একটি কৃত্রিম অজুহাতে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। তিনি কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে মার্কিন জনগণের কল্যাণে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ জারি রাখার কারণে এই বৈরী আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই রায়ের পর তার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে তিনি আইনি লড়াই জারি রাখবেন এবং এই ধরণের কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করতে আরও পদক্ষেপ নেবেন।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই আইনি লড়াইয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন দেশের অন্যান্য স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কতটা বাড়াতে পারবে। একই দিনে সুপ্রিম কোর্ট অন্য একটি পৃথক রায়ে প্রেসিডেন্টকে অন্যান্য ফেডারেল এজেন্সির প্রধানদের বরখাস্ত করার ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করলেও একমাত্র ফেডারেল রিজার্ভকে এর বাইরে রেখেছে। এই দ্বৈত সিদ্ধান্তের কারণে আমেরিকার আর্থিক বাজার এবং international বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে যা আগামী দিনে মার্কিন সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষার এই ঐতিহাসিক নজিরটি ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হবে।

banner
Link copied!