যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় হত্যা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো। ১৯৯৬ সালে ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ নামের একটি নির্বাসিত গোষ্ঠীর দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় গত ২০ মে মিয়ামির আদালতে এই অভিযোগপত্র উন্মোচন করা হয়। এই ঘটনায় চারজন মার্কিন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ আসলে কী হবে এবং ৬৬ বছর বয়সী কমিউনিস্ট সরকারের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে।এটি কেবল একটি আইনি নোটিশ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, কিউবার সঙ্গে নতুন করে কোনো সামরিক উত্তেজনার প্রয়োজন নেই বলে তিনি মনে করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে একটি ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না বলেও হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে চরম জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত কিউবার অর্থনীতি। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওয়াশিংটন অন্তত তিনটি ভিন্ন পথে এগোতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
প্রথম সম্ভাবনাটি হলো সরাসরি সামরিক অভিযান। গত জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোরা যে ধরনের ঝটিকা অভিযান চালিয়েছিল, কিউবাতেও ঠিক তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ১৯৮৯ সালে পানামার তৎকালীন নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকেও একইভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে ক্ষমতাচ্যুত ও আটক করেছিল মার্কিন বাহিনী।ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কট এই ধারণাকে ব্যাপকভাবে উসকে দিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মাদুরোর ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, রাউল কাস্ত্রোর ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটা উচিত।
ওয়াশিংটন অফিস অন ল্যাটিন আমেরিকার (WOLA) বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম আইজ্যাকসনের মতে, সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাস্ত্রোকে আটক করা অসম্ভব কিছু নয়। তিনি বলেন, "প্রতীকী মূল্যের কারণে তাঁকে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়, তবে ৯৪ বছর বয়সী এই নেতাকে বের করে আনা হয়তো সহজ হতে পারে।" কিন্তু আইজ্যাকসন মনে করেন, এর কৌশলগত রাজনৈতিক মূল্য খুব সামান্য। কারণ কাস্ত্রো ২০১৮ সালেই প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়েছেন এবং বর্তমানে তিনি দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে নেই। এই ধরনের অভিযান যুক্তরাষ্ট্রে শুধুই একটি অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক বিজয় এনে দিতে পারে।দ্বিতীয় পথটি হলো কিউবার ভেতরেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটানো।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে কিউবার ভেতরের কিছু নেতার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (CIA) পরিচালক জন র্যাটক্লিফ কিউবার শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন। এই তালিকায় আছেন রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল গিলের্মো রদ্রিগেজ কাস্ত্রো এবং দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাজারো আলভারেজ কাসাস।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পছন্দ হলো একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতামূলক চুক্তি। এর আওতায় কিউবাকে নিজেদের অর্থনীতি উন্মুক্ত করা এবং রুশ বা চীনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার কঠিন শর্ত দেওয়া হতে পারে।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ল্যাটিন আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক মাইকেল শিফটার অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার মতো কিউবাতেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা এড়াতে চায়। জোর করে সরকার পতন ঘটানো এই মুহূর্তে ওয়াশিংটনের জন্য অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তৃতীয় সম্ভাবনাটি হলো অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পতন। কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি ও খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কিউবা। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে বহিরাগত সামরিক চাপ ছাড়াই দেশটিতে একটি স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন বা গণঅভ্যুত্থান আসতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছেন।তবে শিফটারের মতে, কিউবার ক্ষমতার কাঠামো ভেনেজুয়েলার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ অনুযায়ী রাতারাতি কোনো বিকল্প নেতা তৈরি হওয়া বেশ কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ জানিয়েছেন, প্রায় ৭০ বছরের মধ্যে এই প্রথম কিউবার শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হলো।
কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল এই আইনি পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি একে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেন।
